অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর

প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা

দেড় বছরের এই পরিক্রমায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এক দিকে যেমন বৈপ্লবিক কিছু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংস্কারের ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ বনাম ‘মাঠপর্যায়ের অসহিষ্ণুতা’ এই দুইয়ের দোলাচলেই অতিবাহিত হয়েছে তাদের শাসনকাল।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পূর্ণ হতে চলল। রাষ্ট্র সংস্কারের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা এই সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে। দেড় বছরের এই পরিক্রমায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এক দিকে যেমন বৈপ্লবিক কিছু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে, অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংস্কারের ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ বনাম ‘মাঠপর্যায়ের অসহিষ্ণুতা’ এই দুইয়ের দোলাচলেই অতিবাহিত হয়েছে তাদের শাসনকাল।

১. বিচার ও প্রশাসন : আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা ও সীমাবদ্ধতা : সরকারের সবচেয়ে বড় ফোকাস ছিল রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দলীয়করণ ও দুর্নীতি নির্মূল করা।

বিভাগ পুনর্গঠন : গত বছর ১২ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দু’টি আলাদা বিভাগ গঠন করা হয়। এটি ছিল সংস্কারের একটি বড় পদক্ষেপ। যদিও কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে সরকারকে বেশ কিছু সংশোধনী আনতে হয়েছে।

বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন : দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ জারি করেছেন। ১৯৯৯ সালের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায় থেকে শুরু হওয়া দুই দশকের বেশি সময়ের দীর্ঘ যাত্রায় এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: আমিরুল ইসলাম ও মহাসচিব মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার দেশের জনগণের বহুল আকাক্সিক্ষত স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করেছে। এই অধ্যাদেশ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অন্যতম বন্দোবস্ত এবং ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে থমকে থাকা বড় বড় দুর্নীতির মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও নির্বাচন কমিশন সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়ে ব্যক্তি পরিবর্তনই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক ক্ষেত্রে।

মব জাস্টিস ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : এই দেড় বছরে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় ছিল ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত সহিংসতার শিকার হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন করতে হলেও ‘মব’ নিয়ন্ত্রণে তারা প্রায়ই পরাস্ত হয়েছে।

২. ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক শুদ্ধি অভিযান : সংস্কারের ‘লিজ’ বিতর্ক

অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে সরকার ‘উদারনৈতিক নীতি’ গ্রহণ করেছে, যা একই সাথে প্রশংসা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

ব্যাংকিং সংস্কার : বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাতকে টেনে তুলতে পর্ষদ পরিবর্তন এবং তারল্য সঙ্কট মেটানোর চেষ্টা ছিল দৃশ্যমান। এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন বড় গোষ্ঠীর ঋণের তদন্ত শুরু হয়েছে। দুদকের মামলায় বিভিন্ন আদালত থেকে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদারসহ ব্যাংক লুটেরাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে। এ ছাড়া ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, দুই সন্তান সজিব ওয়াজেদ জয় ও পুতুল, বোন রেহেনা ও তাদের পরিবারের দেশী, বিদেশী সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশনা দিয়েছে। তাদের বিদেশে পাচারকৃত টাকা ফেরত আনতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যা দুর্নীতি প্রমাণে বিদেশেও ডকুমেন্ট আকারে ব্যবহৃত হয়েছে।

বন্দর ও টার্মিনাল হস্তান্তর : সরকারের সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের একটি হলো দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সমুদ্র ও নৌ-টার্মিনাল বিদেশীদের হাতে ছেড়ে দেয়া। পতেঙ্গা টার্মিনাল ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালকে ৩৩ বছরের জন্য এবং পানগাঁও টার্মিনাল সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে ২২ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছে। একই দিন বিকেলে বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌটার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিটিসি) পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ছেড়ে দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে সরকার। মাত্র দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেয়ার পথে থাকলেও এসব চুক্তির ফলাফল বাংলাদেশকে বহন করতে হবে দীর্ঘদিন। এ ছাড়াও গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেশ কিছু বড় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দু’টি বিভাগ করে ১২ মে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার। পরবর্তী সময়ে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে, রাজস্বনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, দু’টি বিভাগেই রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞদের নিয়োগসহ ঘোষিত অধ্যাদেশে বেশ কিছু সংশোধনী আনে সরকার।

৩. সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সরকার একটি অভূতপূর্ব উদারতার পরিচয় দিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

প্রথমবারের মতো শিল্পকলা একাডেমিতে চার ধর্মের প্রধান উৎসবগুলো রাষ্ট্রীয় আয়োজনে পালিত হয়েছে। আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টার সোশ্যাল মিডিয়া টিমের আধুনিক ‘ফিল্মমেকিং’ স্টাইল বাংলাদেশের সরকারি প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

৪. সংস্কার কমিশনের সুপারিশ : নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

সংবিধান সংস্কার কমিশন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’র বদলে ‘জনগণতন্ত্রী’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র বদলে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দ যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব রাখবে। দার্শনিক স্লাভয় জিজেকের তত্ত্ব টেনে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, সরকার কেবল ‘শব্দ’ পরিবর্তনের মাধ্যমে বা ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ দিয়ে মূল সমস্যাগুলো ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা প্রশ্নাতীত নয়।

৫. চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ : নির্বাচন ও স্থিতিশীলতা

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতার মাপকাঠি এখন নির্ভর করছে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর। সম্প্রতি ‘ন্যারেটিভ’ নামক সংস্থার জরিপ বলছে, জনগণ সংস্কার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা-উভয়টিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। দেড় বছরের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির হিসাব যাই হোক, আগত নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি ভঙ্গুর কিন্তু সংস্কারের পথে থাকা রাষ্ট্র রেখে যাওয়াই হবে এই সরকারের শেষ সার্থকতা।