নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী বলেছেন, জনগণের আস্থা পুনর্গঠন নতুন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার বন্ধন পুনরুদ্ধার না করে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
নতুন সরকারের করণীয় সম্পর্কে দৈনিক নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘ দিন ধরেই সরকারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; জনবান্ধব শাসনব্যবস্থার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়, বাস্তবে তা অনেকসময় টেকসই হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে পড়ে এবং সরকার ধীরে ধীরে জনগণ থেকে দূরে সরে যায়। মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়- তারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল জীবন চায়। নতুন সরকার কিভাবে এগোবে তা সময়ই বলবে; তবে অতীত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, জনগণ তাদের জীবনমানের নিরাপত্তা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কল্যাণে উন্নয়ন প্রত্যাশা করে।
ড. বুলবুল সিদ্দিকী নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের পরিচালক। তিনি যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি থেকে নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি অর্জন করেছেন। অভিবাসন, রোহিঙ্গা সঙ্কট, ধর্ম ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তার বিস্তৃত গবেষণা রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট কেন ঘুরে ফিরে আসে?
ড. বুলবুল সিদ্দিকী : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার সঙ্কট ও জটিল মোড়ে চিহ্নিত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে জাতি গঠনের ভঙ্গুর ও জটিল সমীকরণ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ যেমন গভীর সঙ্কট তৈরি করেছে, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক একীকরণের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। ১৯৯০-এর দশক ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য জনগণের আকাক্সক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যদিও পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রূপান্তর তখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা আবারো বাধাগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা সুসংহত হয়। সেই ধারাবাহিকতা শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিদ্রোহে গড়ায়। বিদ্রোহ-পরবর্তী দেড় বছরে সংস্কার ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা-উদ্যোগ দেখা গেলেও, তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা অনেকাংশে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর গঠনমূলক ভূমিকার ওপর নির্ভর করবে।
নয়া দিগন্ত : জুলাই আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে, বিশেষত রাষ্ট্রব্যবস্থায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার প্রেক্ষাপটে- এ বিষয়ে আপনার মত কী?
ড. বুলবুল সিদ্দিকী : মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়া উচিত নয়। তাই নির্বাচিত সরকারের ওপর প্রত্যাশার চাপও বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এমন চাপ ছিল। তবে মনে রাখতে হবে, সব সমস্যার সমাধান এক দিনে সম্ভব নয়।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ৩১টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। এতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের পরিবার সুরক্ষা, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা, যুবকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান, ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা বলা হয়েছে, যা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রযন্ত্রে একটি শোষণমূলক কাঠামো গড়ে উঠেছে, যার ফলে সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীর উত্থান হয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে ফেলা জরুরি। এটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকতায় গভীরভাবে প্রোথিত; তাই সমাধানও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই আসতে হবে। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিকে পূর্ববর্তী জনবিরোধী শাসনধারা থেকে সরে এসে প্রমাণভিত্তিক জনকল্যাণকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। তবেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার ঘাটতি দূর করা সম্ভব।
নয়া দিগন্ত : ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে তারা ব্যবসা ছেড়ে দেবেন। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে কি এটিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?
ড. বুলবুল সিদ্দিকী : অবশ্যই। জন-আস্থা পুনর্গঠনই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আস্থা ফিরিয়ে আনতে জনগণের জরুরি উদ্বেগগুলো চিহ্নিত করে সাড়া দিতে হবে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নীতিমালা যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা না করে; বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেয়। উদাহরণ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বলা যায়- যথাযথ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত মুদ্রাস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমাতে পারে।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। পূর্ববর্তী সময়ে নিরাপত্তাহীনতা নাগরিক জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও ব্যাপক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। ‘জনতার বিচার’ সংস্কৃতি আইনের শাসনকে দুর্বল করে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতি মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে দুর্নীতি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের গভীরে প্রোথিত। অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
নয়া দিগন্ত : একসময় বলা হতো ‘মেগা উন্নয়ন মানেই মেগা দুর্নীতি’- আপনার মত কী?
ড. বুলবুল সিদ্দিকী : গত দশকে মেগা প্রকল্প উন্নয়নের প্রধান আখ্যান ছিল; কিন্তু তা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও শোষণমূলক অনুশীলন প্রকল্পগুলোর সাথে যুক্ত ছিল। বর্তমান সরকারকে উন্নয়ন উদ্যোগে সতর্ক থাকতে হবে এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাতীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা জরুরি। সংস্কার ও উন্নয়নকে সমান্তরাল ও আন্তঃসংযুক্ত প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নয়া দিগন্ত : যেসব বিষয়ে বিএনপির আপত্তি নেই, সেসব ক্ষেত্রে দ্রুত সংস্কার সম্ভব কি?
ড. বুলবুল সিদ্দিকী : সরকার ও বিরোধী দলের গঠনমূলক সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেয়া উচিত। সংস্কার এককালীন ঘটনা নয়; এটি চলমান প্রক্রিয়া। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি না থাকে।
ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের পুরনো ধারা পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি পরিহার করে গঠনমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। জনকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী- উভয়েরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। আশা করি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক সভ্যতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে কার্যকর সংসদীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলবে, যা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিকের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এভাবেই বাংলাদেশ মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত রাষ্ট্রের পথে এগোতে পারবে।



