মাগুরার ৩ উপজেলায় প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের জরিপ

জিটি রোডসহ ৪ ঐতিহাসিক স্থাপনাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণার প্রস্তুতি

Printed Edition

এরশাদ আলী খুলনা ব্যুরো

ঐতিহাসিক গ্র্যান্ডট্রাংক (জিটি) রোড, রাজা সীতারামের রাজধানী, ইসলামী রেনেসাঁর কবি খ্যাত ফররুখ আহমদসহ তিন বিখ্যাত কবির জন্মস্থান এবং কবি বড়ু চন্ডীদাসের স্মৃতিসমৃদ্ধ মাগুরার শালিখা, মহম্মদপুর ও শ্রীপুর উপজেলা। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় চলতি বছরের প্রথমার্ধে এই তিন উপজেলায় প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। জরিপে ৬৮টি প্রতœস্থানের তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ রিপোর্টটি প্রকাশের উদ্যোগ চলছে। এর মধ্যে গ্র্যান্ডট্রাংক রোড, গঙ্গারামপুরের শিবমন্দির, জমিদার সীতারাম রায়ের তোষাখানা ও শ্রীপুর জমিদার বাড়ির তোরণকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিভাগীয় প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের সূত্রানুযায়ী, ৬৮টি প্রতœস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার পূর্ব নারায়ণপুর গ্রামে (প্রাচীন নাম ভূষনা বা সতাই) রাজা সীতারাম রায়ের রাজধানী এবং শ্রীপুর উপজেলায় মুজদিয়া গ্রামে ‘ওস্তাদের কদর’ কবিতার জন্য বিখ্যাত কবি কাজী কাদের নওয়াজের বাড়ি আগে থেকেই সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। কাদের নওয়াজ আমাদের কাছে যতটা পরিচিত, রাজা সীতারাম রায় ততটা নন। নবাব শায়েস্তা খান তাকে সেখানে জমিদারি দান করেন। মোগল স¤্রাট শাহজাহানের শেষ সময়ে তার উত্তরাধিকার নিয়ে গোলযোগ চলাকালে তিনি নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মহম্মদপুর থেকে দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকার ওপর তার কর্তৃত্ব বিস্তার করেন। ১৭১৪ সালে তার মৃত্যু হয়।

স¤্রাট শেরশাহ লাহোর থেকে দিল্লি ও কলকাতা হয়ে সোনারগাঁ পর্যন্ত গ্র্যান্ডট্রাংক রোড (জিটি রোড) নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক এ সড়ক যশোরের বেনাপোল দিয়ে ঢুকে বর্তমান মাগুরা জেলা হয়ে ফরিদপুরে প্রবেশ করে। এ সড়কের মহম্মদপুর ও শালিখা উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রাম থেকে নহাটা, গঙ্গারামপুর, বুনাগাতি হয়ে সরুয়েনা গ্রাম পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার অংশ জরিপে শনাক্ত হয়েছে। রোডের পুরোটাই এখন পাকা। শিগগিরই এ রাস্তাটুকু সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জরিপে চিহ্নিত মোগল আমলে নির্মিত গঙ্গারামপুরের আটচালা শিবমন্দির, রাজা সীতারামের বাড়ির সাতটা স্থাপনার মধ্যে তোষাখানা এবং শ্রীপুরের জমিদার বাড়ির তোরণ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম স্থাপনাটি ভগ্নপ্রায় অবস্থায় এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।

জরিপে শালিখা উপজেলার গোপালগ্রামে বায়তুন নূর বা শাহি মসজিদ হিসেবে পরিচিত একটি মসজিদ শনাক্ত হয়েছে। সেটা মোগল আমলে নির্মিত বলে অনুমিত হয়। পাওয়া গেছে একই সময়ে নির্মিত মুহম্মদপুরের রাঢ়িখালি গ্রামে জমিদার উদয় নারায়ণ চৌধুরীর বাড়ি, শালিখার বামনখালি গ্রামে নীলকুঠির কুঠিয়ালের বাসভবন এবং শ্রীপুর উপজেলার মাঝাইল গ্রামে কবি ফররুখ আহমদেরও বাড়ি। বাড়িটির ওপর দিয়ে রেললাইন স্থাপনের জন্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার সেটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে উদ্যোগটি এখন স্থগিত রয়েছে।

‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ/ মাগো আমার ষোলক বলার কাজলা দিদি কই’, কাজলা দিদি নামে যতীন্দ্রমোহন বাগচীর লেখা কবিতা স্কুলের পাঠ্যবইতে পড়ে কৈশোরে সবাই আলোড়িত হয়েছেন। এ কবির পৈতৃক নিবাস ছিল শ্রীপুর উপজেলার সেনগাতি-সরই নগর গ্রামে। তারা পশ্চিম বাংলায় চলে যাওয়ার সময় একটি মুসলিম পরিবারকে সব সম্পত্তি দিয়ে যান। তারা সেখানে বাস করছেন। তবে পুকুর, পরিবারের মন্দির, পানির কূপ ইত্যাদি এখনো রয়েছে।

প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবিদের একজন বড়– চন্ডীদাস। উচ্চবর্ণের চন্ডীদাস নিচুবর্ণের রজকিনীর প্রেমে মজেছিলেন। তাদের প্রেমকাহিনী হিন্দু সমাজে চর্চিত হয়। তাদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়েছে শালিখা উপজেলার ধোপাখোলা গ্রামে চিত্রা, ফটকি ও বেগবতী নদীর সঙ্গমস্থলে চন্ডীদাস-রজকিনীর ঘাট। নদীগুলো অবশ্য সরে গিয়ে সেখানে একটা বাঁওড় আছে। কিছু দূরে আছে রজকিনীর বাড়ির ধ্বংসস্তূপ।

এসব সাইট বা স্থাপনা জরিপ রিপোর্টে স্থান পেলেও প্রয়োজনীয় প্রতœবস্তু বা বয়স বিবেচনায় পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়নি বলে জানা যায়।

এ ব্যাপারে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক মো: মহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা জানুয়ারি- এপ্রিল সময়ে মাগুরার মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর উপজেলায় প্রতœতাত্ত্বিক জরিপ করেছি। ৬৮টি প্রতœস্থানের তথ্য সংগ্রহ হয়েছে। এর মধ্যে জিটি রোড বা শেরশাহশুরী সড়ককে পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষিত বলে দ্রুত ঘোষণার আশা করছি। আরো তিনটিকে সংরক্ষিত ঘোষণার প্রস্তাব করা হয়েছে।