পটল আর সোনার ড্রাগন

Printed Edition
পটল আর সোনার ড্রাগন
পটল আর সোনার ড্রাগন

জুয়েল আশরাফ

কলাগাছতলা নামের ছোট্ট এক গ্রাম। সেই গ্রামে থাকে পটল। বয়স মাত্র ১০ বছর। সারাদিন লাফালাফি করে, গাছে উঠে, নদীতে ঝাঁপ দিয়ে, পাটকাঠির ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। গ্রামের মানুষ হাসতে হাসতে বলে, ‘এই ছেলেটা একদিন না একদিন কোনো ভয়ঙ্কর ঝামেলা পাকাবে।’ কিন্তু পটল নিজের মনে ভাবে, ‘আহা! আমি যদি একদিন কোনো বীর হই! রাজা যদি আমাকে দেখে বলে, বাহ! এ যে আমার আসল সেনাপতি!’ একদিন গ্রামের হাটে পটল দেখল, লোকজন ভয়ে কাঁপছে। হাটে কেউ গান গাইছে না, বাঁশি বাজাচ্ছে না। সবাই ফিসফিস করছে। এক বৃদ্ধা বলল, ‘ওরে, রাত হলে পাহাড় থেকে এক সোনালি ড্রাগন বেরোয়। খামার থেকে গরু-ছাগল তুলে নিয়ে যায়। কখনো কখনো মানুষকেও। কার সাহস আছে ড্রাগনের মুখোমুখি হয়!’ পটল চোখ বড় করে বলল, ‘ড্রাগন? তাহলে তো আমাকে বীর হওয়ার দারুণ সুযোগ এসে গেছে!’ সেদিনই পটল গোপনে হাট থেকে এক পেয়ালা গুড় কিনল। গুড় মাটির হাঁড়িতে রেখে দিলো। চারদিন পর হাঁড়ির ভেতরে পিঁপড়ার ঝাঁক! পটল হাঁড়ির উপরে হাত দিয়ে চাপ দিলো। একেবারে আঠালো হয়ে অনেক পিঁপড়া মারা গেল। পটল গুনল, মরা পিঁপড়া এক শ’! আহত পিঁপড়া দেড় শ’! সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ‘বাহ! আমি তো মহা যোদ্ধা হয়ে গেছি!’ এরপর কী কাণ্ড! পটল হাট থেকে এক ফকফকে লাল রঙের ফাটা সৈন্যের টুপি কিনল। টুপিটা মাথায় দিয়ে বাঁশের লাঠি হাতে রাজপ্রাসাদের সামনে গিয়ে হাজির। ‘ওহে রাজামশাই! আমি মহা বীর পটল! গত সপ্তাহেই আমি একশ জনকে খতম করেছি, দেড় শ’ জনকে আহত করেছি। আমাকে সেনাপতি বানান!’

রাজা তাকিয়ে হেসে উঠলেন। ‘তুই এই ছোট্ট চিকন ছেলে? সেনাপতি হবি?’ পটল বুক ফুলিয়ে বলল, ‘চেহারা দেখে বিচার করবেন না, মহারাজ। আমাকে পরীক্ষা দিন। আমি ড্রাগনকে মেরে ফেলব!’ রাজা একটু অবাক হলেন। আসলেই তো, এত সৈন্য গেল, কেউ বাঁচল না। এখন যদি এই দুষ্টু ছেলেটিই ড্রাগনকে বোকা বানাতে পারে? রাজা বললেন, ‘যাও, যদি ড্রাগনকে হত্যা করতে পারো, তাহলে তোমাকেই আমি সেনাপতি বানাব।’ রাতে সবাই যখন ঘুমাচ্ছে, পটল এক পকেটে গুড়ের বড় বল ভরে নিলো। অন্য পকেটে রাখল একখানা ছোট্ট কবুতর। তারপর পাহাড়ের গুহার দিকে রওনা দিলো। হঠাৎ সশব্দে ডানা ঝাপটে এক বিশাল সোনালি ড্রাগন বেরিয়ে এলো। চোখ থেকে আগুন ঝরে পড়ছে। গলায় যেন বজ্রের শব্দ। ড্রাগন গর্জে উঠল, ‘কে আছে ওখানে? মানুষের গন্ধ পাচ্ছি!’ পটল ভয়ে কাঁপলেও বুক চিতিয়ে চিৎকার দিলো, ‘এই যে! আমি পটল বীর! এক শ’ লোক মারি, দেড় শ’ আহত করি। তুমি আমার সাথে পারবে?’ ড্রাগন হাসল, ‘প্রমাণ করো!’

পটল পকেট থেকে গুড়ের বল বের করে বলল, ‘এটা পাথর! দেখছ?’ ড্রাগন বলল, ‘হ্যাঁ, গোল পাথর।’

পটল বলটা শক্ত করে চেপে ধরতেই গুড় মাখামাখি হয়ে মাটিতে পড়ল। ড্রাগন অবাক হয়ে গেল, ‘হায় হায়! এ যে শক্তিশালী মানুষ!’

এরপর ড্রাগন আকাশে এক বিশাল পাথর ছুড়ে বলল, ‘এইভাবে দেখাও শক্তি।’

পটল বলল, ‘আমি যদি ছুড়ি, তবে আর নিচে নামবে না। আকাশ ফেটে যাবে।’ বলতে বলতে পকেট থেকে কবুতরটা উড়িয়ে দিলো। কবুতর উড়ে উড়ে হারিয়ে গেল। ড্রাগন হা করে তাকিয়ে রইল। পাথর তো পড়ল না! ড্রাগন ভয় পেয়ে বলল, ‘আহা! তুমি সত্যিই বীর। এসো আমার গুহায় অতিথি হয়ে থাকো।’ ড্রাগনের গুহায় ঢুকে পটল দেখল, ভেতরে সোনার পাহাড়, রূপার ঝাঁপি, হীরের মতো ঝলমলে ফুল। ড্রাগন বলল, ‘আগুন জ্বালাতে কাঠ আনো।’ পটল বলল, ‘কাঠ কেন? আমি পুরো পাহাড়টাই টেনে আনব।’ ড্রাগন ভয়ে দৌড়ে গিয়ে নিজেই কাঠ নিয়ে এলো। ড্রাগন বলল, ‘এবার কূপ থেকে পানি আনো।’ পটল বলল, ‘আমি তো দড়ি দিয়ে কূপ বেঁধে নিয়ে আসব।’ ড্রাগন তড়িঘড়ি নিজেই পানি আনল। রাতে ড্রাগন বলল, ‘চলো প্রতিযোগিতা করি। কে কতটা দই খেতে পারে!’ পটল গোপনে বস্তা পেটে বেঁধে নিলো। দই খেল ভান করে সবটুকু বস্তায় ঢেলে দিলো। তারপর ছুরি দিয়ে বস্তা কেটে দেখাল, ‘দেখো, আমার পেটের ভেতর দই ভর্তি!’ ড্রাগন চোখ কপালে তুলে বলল, ‘ওরে বাপ! আমি-ও পারি!’ সে গপাগপ খেয়ে ফেলল এক ডেগচি দই। তারপর ছুরি দিয়ে নিজের পেট কেটে দেখাতে গিয়ে ফস্ করে পড়ে গেল। ড্রাগন শেষ। ভোরবেলায় পটল সোনার পাহাড় থেকে এক মুঠো সোনা-রোপা নিয়ে রাজপ্রাসাদে হাজির। রাজা বিস্ময়ে বললেন, ‘তুমি সত্যিই ড্রাগনকে মেরেছ?’ পটল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, আর ড্রাগনের সোনা-রূপাও এনেছি।’ রাজা খুশি হয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘আজ থেকে পটল হবে আমাদের সেনাপতি!’ গ্রামের সবাই অবাক হয়ে হাসল। ‘আরে, ও যে আমাদের দুষ্টু পটল! এ যে আসলেই বীর পটল হয়ে গেল!’ পটল মনে মনে বলল, ‘আহা! চালাকি থাকলে বীর হতে তলোয়ারের দরকার হয় না।’