স্বপ্নভঙ্গ হলেও আশায় বাংলাদেশ

Printed Edition
এশিয়া কাপ অনূর্ধ্ব-২০ নারী হকিতে বাংলাদেশ ও জাপানের ম্যাচের দৃশ্য : হকি ফেডারেশন
এশিয়া কাপ অনূর্ধ্ব-২০ নারী হকিতে বাংলাদেশ ও জাপানের ম্যাচের দৃশ্য : হকি ফেডারেশন

ক্রীড়া প্রতিবেদক

পারল না মেয়েরা। স্বপ্নের দুয়ারে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হলো। শক্তিশালী জাপানের কাছে মাত্র দুই গোলের ব্যবধানে হেরে শেষ হয়ে গেল বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে একেকজন মেয়ের চোখের পানি যেন বলে দিচ্ছিলÑ এটা শুধুই একটি ম্যাচের হার নয়, ভেঙে পড়েছে বুকের ভেতর যতœ করে লালন করা একটি স্বপ্ন। মাঠে তখন আর কোনো কৌশল, কোনো হিসাব, কোনো স্কোরলাইন নেই। আছে শুধু অশ্রুসিক্ত কিছু মুখ। মলিন চোখ, অসহায় চাহনি, বুকভরা কষ্ট। মনে হচ্ছিল, প্রিয় কিছু হারানোর বেদনায় যেন মেয়েগুলো নিঃশব্দে কাঁদছে। তাদের কান্না ছুঁয়ে গেছে বাংলাদেশের হকিভক্তদের হৃদয়ও। টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা মাঠের গ্যালারিতে যারা দেখেছেন, তাদের বুকেও নিশ্চয়ই জমেছে একই হাহাকারÑ আহা, আর একটু যদি!

কিন্তু এই কান্নার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নারী হকির সবচেয়ে বড় আশার আলো।

যে মেয়েরা কয়েক বছর আগেও আন্তর্জাতিক হকির বড় মঞ্চে ছিল অচেনা, সেই মেয়েরাই আজ শক্তিশালী জাপানের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে। জয় পায়নি, বিশ্বকাপের টিকিটও মেলেনিÑ কিন্তু তারা দেখিয়ে দিয়েছে, স্বপ্ন দেখার সাহস তাদের হয়েছে। আর যে জাতি স্বপ্ন দেখতে শেখে, তাকে এক দিন না এক দিন স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতেই হয়।

আজ চোখের পানি মুছে ফেলো মেয়েরা। এই কান্না পরাজয়ের প্রতীক নয়; এই কান্না তোমাদের হকির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ। লাল-সবুজের প্রতি তোমাদের দায়বদ্ধতার প্রমাণ। হয়তো আজ নয়, কালও নয়। কিন্তু তোমাদের এই ভালোবাসা, এই কষ্ট, এই লড়াই এক দিন পথ দেখাবে বিশ্বকাপের মঞ্চে। সেদিন হয়তো এই কান্নার কথাই মনে পড়বে। আর তখন চোখের পানির বদলে গাল বেয়ে নামবে আনন্দের অশ্রু।

জুনিয়র এশিয়া কাপ হকিতে সেরা তিনে থাকলেই মিলতো জুনিয়র বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ। সেই ল্েযই এগোচ্ছিল বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী হকি দল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা করে নেয়ার সুযোগ হারায় বাংলাদেশের মেয়েরা।

চীনের মোকি শহরে অনুষ্ঠিত কোয়ার্টার ফাইনালে জাপানের বিপে শুরুতে ভালো করলেও গোলের দেখা পায়নি। ২৬ মিনিটে পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে জাপানকে এগিয়ে দেন ইয়োশিরো হিরাই। শেষ কোয়ার্টারের ৪৭ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন মোমোকা সুজুকি।

এর আগে চ্যালেঞ্জার পুলে দুর্দান্ত খেলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশের হেড কোচ আরিফ আলী এখনো বিশ্বকাপের আশা পুরোপুরি ছাড়ছেন না। ১২ সেপ্টেম্বর পঞ্চম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মালয়েশিয়া ও দণি কোরিয়ার মধ্যকার ম্যাচে হারা দলের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার পথ অবশ্য এখন টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত অবস্থান ও এশিয়ার কোটা নির্ধারণের ওপর নির্ভর করছে। তবে সাধারনভাবে চার সেমিফানালিস্টই বিশ্বকাপের টিকিট কাটার কথা।

জাপানের বিপে ম্যাচের পর প্রধান কোচ আরিফ বলেছেন, ‘বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে ম্যাচটি একতরফা ছিল। কিন্তু আমরা জাপানের বিপে ম্যাচটা দারুণভাবে লড়েছি। মেয়েদের নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত। তারা খুব ভালো খেলেছে এবং শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত লড়াই করেছে। আমরা ম্যাচে সমতা ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেছিলাম, এমনকি এগিয়েও যেতে পারতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গোল করতে পারিনি। তবে মেয়েদের নিয়ে আমি সত্যিই গর্বিত। শুধু আফসোস, গোলটা আসেনি। আমরা জাপানকে দেখিয়ে দিয়েছি আমরা কী করতে পারি। জুনিয়র এশিয়া কাপের সবাইকেও আমরা দেখাতে পেরেছি, বাংলাদেশ কী করতে পারে।’

২০২৭ নারী জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে এশিয়া মহাদেশ থেকে মূলত ৪টি দল অংশ নেবে, তবে এশিয়ার কোনো দেশ আয়োজক হলে মোট পাঁচটি দল খেলার সুযোগ পাবে। আরিফ রয়েছেন সেই আশায়, ‘সাধারণত চারটি দল থাকে। তবে এশিয়ায় কোনো দেশ স্বাগতিক হলে আমরা একটি অতিরিক্ত জায়গা পেতে পারি। কিন্তু এখনো স্বাগতিক ঠিক হয়নি। স্বাগতিক নিশ্চিত হলে তারা জানাবে কতটি দলকে নিয়ে আয়োজন করতে পারবে। গতবার ছয় থেকে সাতটি দল খেলেছিল। তাই আশা করছি, এশিয়ার জন্য আরো একটি জায়গা থাকবে। বাংলাদেশের হকির জন্যÑ সেটি দারুণ হবে।’

শেষ ম্যাচটি জিতে টুর্নামেন্টটা ভালোভাবে শেষ করতে চান বাংলাদেশের কোচ। আরিফ বলেন, ‘আমরা অবশ্যই সেটাই আশা করছি। টুর্নামেন্টটা শক্তভাবে শেষ করতে চাই। এখন ভালোভাবে রিকভার করে পরের ম্যাচে মনোযোগ দিতে হবে।’