অবশেষে সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আলোর মুখ দেখেছে সিলেট-চারখাই-শেওলা চার লেন মেগা প্রকল্প। গত সপ্তাহে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অর্থ বরাদ্দ অনুমোদনের পর ভূমি অধিগ্রহণ ও জরিপ কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। চার লেন সড়ক যোগাযোগের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ব সিলেটের পাঁচ উপজেলায় যুগান্তকারী উন্নয়নের সূচনা হবে বলে আশা করছেন এলাকাবাসী।
ভারতের সাথে বাণিজ্য ও যাতায়াত সহজ করতে প্রকল্পটি হাতে নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। একনেকে অনুমোদনের তিন বছর পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গত বুধবার আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন দেয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সব বাধা দূর হয়ে এখন কাজ শুরুর তোড়জোড় চলছে। জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং শেওলা স্থলবন্দরের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগ জোরদারে ‘সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫০৬ কোটি সাত লাখ ৩৬ হাজার ২৫৫ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সিলেট থেকে বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি স্থলবন্দর (শেওলা) পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৫০ কিলোমিটার সড়ক চার লেন হবে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সরকারি অর্থায়ন ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘সিলেট-চারখাই-শেওলা মহাসড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের প্যাকেজ ডব্লিউপি-১-এর লট-১, ২ ও ৩-এর পূর্ত কাজের জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলে মোট ৪৭টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে। এর মধ্যে ৩৯টি প্রস্তাব কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য (রেসপনসিভ) হিসেবে বিবেচিত হয়।
দরপত্র মূল্যায়নের সব প্রক্রিয়া শেষে টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) সুপারিশ অনুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতা তিনটি প্রতিষ্ঠানকে তিনটি লটের কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে লট-১-এর কাজ যৌথভাবে মনিকো লিমিটেড এবং চায়না রেলওয়ে নং ৪ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এক হাজার ৯৯ কোটি ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৬ টাকায় বাস্তবায়ন করবে।
লট-২-এর কাজ করবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, এ লটের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টাকা। এ ছাড়া লট-৩-এর কাজ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে এনডিই এবং আরবিসিজি, এ অংশের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে গতি আসবে, পণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং শেওলা স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত হবে। ভারতের সাথে আমদানি রফতানি বাড়বে।
এ দিকে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করেছে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। গত দুই দিনে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ইউনিয়ন এবং শেওলা ইউনিয়নে চার লেন প্রকল্পের জন্য জরিপ কাজ পরিচালনা করে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করেন। এ সময় প্রকৃত জায়গার মালিকের কাছ থেকে জমির প্রয়োজনীয় কাগজ যাচাই-বাছাই করে সেগুলোকে চার লেন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করেন এবং জমির মালিকদের সেগুলো ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন।
জমির মালিকরা সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশ্বাসে সেগুলো স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিতে রাজি হন।
এর আগে জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটিকে বাতিল করার সুপারিশ করেন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক শের মো: মাহবুব মুরাদ। বিষয়টি সর্বত্র জানাজানি হলে সিলেটের পূর্বাঞ্চলজুড়ে ক্ষোভ দেখা দেয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে উপজেলা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও সিলেটস্থ বিয়ানীবাজার জনকল্যাণ সমিতি বেশ তৎপর হয়ে ওঠে। পৃথক স্মারকলিপি প্রদানসহ প্রতিবাদ শুরু হয়। এমন অবস্থায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেন বর্তমান জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম।
এর প্রেক্ষিতে সরকারের বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগ করে চার লেন প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু করেন। প্রকল্পটি শুরু করতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন নিজেদের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ তদবির করেন।
জানা যায়, সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলমের প্রচেষ্টা, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতাদের জোর দাবির প্রেক্ষিতে জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হওয়ায় পূর্ব সিলেটের চারটি উপজেলার জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল একনেক বৈঠকে অনুমোদিত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর।



