বিতর্কিত করতে একটি দল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করছে

ডা: শফিকের টুইটার (এক্স) হ্যাক হওয়ার প্রমাণ দিলো জামায়াত

আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি : অ্যাডভোকেট জুবায়ের

জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট- নারী সমাজ, দেশ, দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা প্রশ্নাতীত। জামায়াত আমির বিষয়গুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সাবলীলভাবে বারবার তুলে ধরেছেন। এসব কারণেই একটি চক্র ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের টুইটার এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তাতে নারীদের নিয়ে অশালীন পোস্ট দিয়ে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে দলটি।

গতকাল রাজধানীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এ সময় আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিমসহ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, আমিরে জামায়াত এবং আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে একটি গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এর অংশ হিসেবে আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে আপত্তিকর ও বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেয়া হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই একটি গোষ্ঠী তাৎক্ষণিকভাবে কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যা আমাদের সন্দেহকে আরো জোরাল করে। আমরা মনে করছি, এর সাথে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাইবার টিম বা সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্রকারী চক্র জড়িত থাকতে পারে। যারা এই চক্রান্ত করেছে, তারা অনেক দিন থেকেই এর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিনি বলেন, জামায়াত আমিরের টুইটার (এক্স) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি এবং এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েছি। এ ঘটনায় রাতেই আমরা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি।

অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, আমাদের সাইবার সিকিউরিটি টিম পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে। আইনি পদক্ষেপসহ সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করব। কারণ এটি একটি চরম ও ন্যক্কারজনক অপপ্রয়াস, যার লক্ষ্য আমিরে জামায়াতসহ আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে বিতর্কিত করা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করা।

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট- নারী সমাজ, দেশ, দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা প্রশ্নাতীত। জামায়াত আমির বিষয়গুলো অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সাবলীলভাবে বারবার তুলে ধরেছেন। এসব কারণেই একটি চক্র ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাদের নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।

জুবায়ের বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বশীল মহলের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাব।

এ সময় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা ও জাতীয় নির্বাচন কমিটির সদস্য পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত ৩১ জানুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে জামায়াত আমিরের অফিসিয়াল এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে সর্বশেষ স্বাভাবিক পোস্ট দেখা যায়। এরপর বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে আমাদের দৃষ্টিগোচরে আসে যে, ৪টা ৩৭ মিনিটে ওই আইডিতে একটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও অনাকাক্সিক্ষত পোস্ট প্রদত্ত হয়েছে, যা আমাদের আদর্শ, চিন্তাধারা ও অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন ওই আইডি পরিচালনা টিমের সাথে যোগাযোগ করলে তারা যাচাই করে আইডিটির হ্যাক হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত করেন। তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের সাইবার সিকিউরিটি টিম পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে এবং আল্লাহর রহমতে ৫টা ০৯ মিনিটে ওই আইডির পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়। পরে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে ওই টুইটার অ্যাকাউন্টে জরুরি ঘোষণার মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, শুধু আমিরে জামায়াতের টুইটার (এক্স) অ্যাকাউন্ট নয়, একইসাথে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের ফেসবুক পেজও সাময়িকভাবে দখলে নেয়া হয়েছিল। রাত সাড়ে ৩টার দিকে আমরা থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করি এবং সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাই। রাতভর ব্যাপক অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে হ্যাকিং প্রক্রিয়ার আদ্যোপান্ত খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার পর সেখানে পোস্ট করে এক মিনিটের মধ্যে স্ক্রিনশট নেয়া হয়। তবে একটি দলের কর্মীরা ৬ ঘণ্টা পর একযোগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করে।

পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ ধরনের অপতৎপরতা চালিয়ে সত্যকে দমন করা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী সত্য ও ইতিবাচক রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকতে চায়। আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন ও অগ্রযাত্রা কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে থামানো যাবে না ইনশাআল্লাহ।

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন টিমের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুর রহমান বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন তুলে ধরেন। এ সময় সাংবাদিকদের সামনে সরাসরি জামায়াত আমিরের ই-মেইল ইনবক্স দেখানো হয়, যেখানে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, লগইন লোকেশন, নতুন আইপি অ্যাড্রেস ও সেশন পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন, এটি যদি নিজস্ব বা ভুলবশত দেয়া কোনো পোস্ট হতো, তাহলে ই-মেইল রিকভারি, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন কিংবা ফরেনসিক ডাটা দেখানোর প্রয়োজন পড়ত না।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, গত এক মাসে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা এবং একাধিক নেতার সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে ধারাবাহিকভাবে সাইবার আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেনের অ্যাকাউন্টেও অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সাইবার আক্রমণের একটি পদ্ধতির কথাও তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, ‘ঈধংব ঝঃঁফু ইএও ঊষবপঃরড়হ’ বা অনুরূপ শিরোনামে সরকারি বা অফিসিয়াল ই-মেইলের আদলে ভুয়া ই-মেইল পাঠানো হয়, যেখানে ‘অত্যন্ত জরুরি’ উল্লেখ করে এক্সেস ফাইল বা অ্যাটাচমেন্ট থাকে। এসব ফাইলের মাধ্যমে ম্যাক্রো, ডাটাবেজ বা ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের ই-মেইল ১০ জানুয়ারিসহ একাধিকবার পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। জামায়াত জানায়, ফরেনসিক পরীায় এসব ফাইলকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট সাইবার সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হবে বলেও জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে মিস ইনফরমেশন ও ডিস ইনফরমেশন ছড়ানো হচ্ছে। যাচাই ছাড়াই কয়েকটি গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

নারীদের বিষয়ে জামায়াত জানায়, নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের ভোট চাইতে গেলে কোথাও কোথাও হামলা, বোরকা খুলে দেয়া ও অশালীন ভাষা ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ‘৪০ লাখ বোরকা’ সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়ে নারীদের ভোটাধিকার থেকে নিরুৎসাহিত করার অপচেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, বিতর্কিত পোস্টের মাত্র দুই ঘণ্টা আগেই আমিরে জামায়াত নারীদের উচ্চশিক্ষা ও অগ্রগতির পক্ষে একটি ইতিবাচক পোস্ট দিয়েছিলেন। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও সংশ্লিষ্ট সব ডাটা, স্ক্রিনশট ও ফরেনসিক রিপোর্ট উপস্থাপন করার কথা জানায় দলটি।