- সরকারি ড্রেজিংয়ে উত্তোলিত বালু গোপনে বিক্রি করছে একটি চক্র
- অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও অবৈধ বালু উত্তোলনে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে
নদী খনন (ড্রেজিং) প্রকল্পে অনিয়ম, অবৈধ বালু উত্তোলন ও দুর্বল তদারকির কারণে রাষ্ট্র প্রতি বছর ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সাথে নদীর নাব্যতা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিচালিত একাধিক ড্রেজিং প্রকল্পে স্বচ্ছতার ঘাটতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন ও পরিবেশবাদী সংগঠন, সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন কার্যকর থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে অনেক ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে তদারকি করা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক প্রকল্পে নামমাত্র খনন অথবা বাস্তবে কাজ না করেই পুরো বরাদ্দ তুলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার বিআইডব্লিউটিএর কিছু ড্রেজিং প্রকল্পে নদী থেকে উত্তোলিত বালু অল্প দূরত্বে আবার নদীতেই ফেলে দেয়া হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে নদী দ্রুত ভরাট হয়ে যায় এবং ড্রেজিংয়ের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
এ ছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ড্রেজিংয়ে উত্তোলিত বালু বা মাটি নিলামে বিক্রি করে রাজস্ব হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এসব বালুর বড় অংশ গোপনে আবাসন প্রকল্প ও ইটভাটায় বিক্রি করা হয়।
সূত্র জানায়, ড্রেজিংয়ের অনুমতির আড়ালে মেঘনা, পদ্মা ও গোমতীসহ বিভিন্ন নদীতে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ-সংক্রান্ত অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে পাউবো ও বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং শাখার একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
দেশের বড় ড্রেজিং প্রকল্পগুলোর মধ্যে যমুনা, গড়াই, মেঘনা ও মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিভিন্ন তদন্ত ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ড্রেজার ও জলযান ক্রয় প্রকল্পে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পে কাগজে-কলমে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের তথ্য থাকলেও কয়েক শ’ কোটি টাকার বালুর হিসাব মেলেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ প্রকল্পেও প্রায় এক হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার কাজে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠে এসেছে। এ ঘটনায় সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক, গোলাম মোস্তফা, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) আবদুল মতিন, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম তালুকদার ও সাঈদুর রহমানের নাম বিভিন্ন অভিযোগে এসেছে।
নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তার মতে, কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা জরুরি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা ছাড়া ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনের কারণে নদীভাঙন, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, ভূগর্ভের পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাসের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ গভীর করে বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীরের নিচে শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এতে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতীর, বসতি, বাজার ও ফসলিজমি ধসে পড়ছে। পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সেতুও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।



