মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে উভয় সঙ্কটে বাংলাদেশ

- কৌশলগত ভুল ছিল : মাহফুজুর রহমান

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উভয় সঙ্কটে পড়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার বিরোধিতা করে বাংলাদেশের অবস্থান আশা করছে ইরান। কিন্তু বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম রফতানি খাত তৈরী পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এসব কারণে ইরানের পক্ষে বাংলাদেশ সরাসরি কোনো অবস্থান নিতে পারছে না।

এ দিকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল বাংলাদেশমুখী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিলেও ইসলামী রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর্পের (আইআরজিসি) বাধার মুখে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পণ্যবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ একাধিকবার চেষ্টা করেও এই প্রণালী পার হতে পারেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের পর থেকে জাহাজটি পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি তুরস্কে অনুষ্ঠিত আন্তালিয়া কূটনীতি ফোরাম সম্মেলনের সাইডলাইনে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটে বাংলাদেশের ধারাবাহিক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা উল্লেখ করে হরমুজ প্রণালী পার হতে বাংলাদেশের পতাকাবাহী ও বাংলাদেশমুখী জাহাজগুলোকে সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে তিনি ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদির সাথে বৈঠকেও একই অনুরোধ জানান। উভয় ক্ষেত্রেই আশ্বাসের বাণী শুনানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই।

১ এপ্রিল ঢাকায় আয়েজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ নিয়ে ঢাকার অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদি বলেছেন, এ-সংক্রান্ত বাংলাদেশের দেয়া বিবৃতি নিয়ে আমাদের কষ্টের জায়গা রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ অবৈধ। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এই অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানাতে পারে। মুসলিম দেশ না হয়েও স্পেনের মতো অনেক ইউরোপীয় দেশ এই অবৈধ যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। আমরা চাই বাংলাদেশ এই অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদ স্পষ্টভাবে জানাক। এর চেয়ে বেশি কিছু না।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ শুরু হলে ইরান বিশেষ করে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করে। বাংলাদেশের দেয়া প্রথম বিবৃতিতে জিসিসি দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে। পরে সমালোচনার মুখে দ্বিতীয় বিবৃতিতে যুদ্ধের প্রথম দিনই নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে; কিন্তু কোনো বিবৃতিতেই ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের নিন্দা জানানো হয়নি। খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ১৩তম সংসদ অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকারের পে ইরান দূতাবাসে শোক বইয়ে স্বার করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপীয়) ড. নজরুল ইসলাম। সর্বশেষ বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মাধ্যমে ইরানে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। ইরান এসব পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও যুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার করার ইস্যুতে অনড় থাকে।

এ ব্যাপারে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে বাস্তবতার নিরিখে সরকার যে অবস্থান নিয়েছিল, তা ঠিকই ছিল; কিন্তু আমাদের ভুলটা হয়েছে কৌশলে। জটিল পরিস্থিতিতে এমন অবস্থান নিতে হয়, যাতে শক্রও আপনাকে মিত্র মনে করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতিটা দেয়ার আগে ইরানকে তার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানানো উচিত ছিল। বলা উচিত ছিল, বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ইরানের পক্ষেই রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও মনে করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তবে কৌশলগত কারণে তা বিবৃতিতে আনা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, একটি দেশ জটিল পরিস্থিতিতে সঙ্ঘাতসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরাগভাজন না হয়েও কূটনৈতিক পন্থা বা কৌশলে কোনো না কোনো পথ বের করতে পারে। যেসব দেশ বৈরী পরিস্থিতির শিকার হয়, তাদের আস্থায় আনার জন্য কূটনীতিতে প্রচুর অপশন থাকে।

ইরানকে বোঝানোর জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর প্রচেষ্টা সম্পর্কে মাহফুজুর রহমান বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশমুখী জাহাজগুলো আসতে না পারায় সরকার বিপদে পড়ে ধরনা দিচ্ছে, এটা ইরান বোঝে। আর বোঝে বলেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশমুখী জাহাজগুলো যেতে দিতে ইরান আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ইরানকে বোঝানোর কাজটা বাংলাদেশের শুরুতেই করা উচিত ছিল। রাষ্ট্র চালানোর জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি আগে থেকেই অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিবৃতি না দেয়াটা বাংলাদেশের জন্য কোনো অপশন ছিল কি না জানতে চাইলে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, আমার ধারণা ইরানের পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রভৃতি দেশ এ ধরনের বিবৃতি দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। ইতঃপূর্বে ইয়েমেনের সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি আরব হুতিদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল। সৌদি আরবের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদের অবস্থানের পক্ষে বিবৃতি দেয়ার জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে টেলিফোন করে অনুরোধ করেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিবৃতিও দিয়েছিল; কিন্তু বিবৃতিটা ভারসাম্যপূর্ণ ছিল। সেই বিবৃতি দেয়ার কারণে কেউ বলতে পারবে না যে, একটি দেশ অন্য একটি দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণ করল, আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন জানালো। এ ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বিবৃতি যেকোনো সময় যেকোনো পক্ষের কাছে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সহায়ক হয়। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বিবৃতি দিয়ে যদি বলতো যে, প্রত্যেককে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তবে তা কারো বিপক্ষে যেত না।

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা নিরসনের কোনো উপায় রয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে মাহফুজুর রহমান বলেন, যে কারণগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই কারণগুলো এখনো বিরাজমান। যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও দুই পক্ষই যুদ্ধংদেহী মনোভাবে রয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধাবস্থা রয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দুই পক্ষ যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে তা হঠকারী। এই হঠকারী সিদ্ধান্তগুলোর কারণে দুই পক্ষ আবারো যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতার জন্য রাজি করাতে যে ধরনের মধ্যস্থতার প্রয়োজন ছিল, সেটি অনুপস্থিত। য্ক্তুরাষ্ট্রের ওপর পাকিস্তানের সেই ধরনের প্রভাব নেই। আর গ্রিনল্যান্ডসহ অন্যান্য ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো মধ্যস্থতা থেকে দূরে সরে রয়েছে। ইরান যেহেতু আক্রান্ত হয়েছে, সে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনে সবকিছুই করবে। আর এই প্রয়োজনের তাগিদেই ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা থেকে পিছপা হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে তা পরোক্ষ; কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য এই চাপটা প্রত্যক্ষ।