আমানত কমে ধার বেড়েছে ঢাকা ব্যাংকের, অচলাবস্থার আশঙ্কা

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকা ব্যাংক পিএলসির গ্রাহক আমানত কমেছে প্রায় ৭১৩ কোটি টাকা, আর একই সময়ে অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক (নেতিবাচক) হয়ে পড়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ইতিবাচক। ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
  • ছয় মাসে আমানত কমেছে ৭১৩ কোটি টাকা
  • মুনাফা কমেছে ১৫ শতাংশ, বেড়েছে ঋণ

চলতি বছরের প্রথমার্ধে ঢাকা ব্যাংক পিএলসির গ্রাহক আমানত কমেছে প্রায় ৭১৩ কোটি টাকা, আর একই সময়ে অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার বেড়েছে প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক (নেতিবাচক) হয়ে পড়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ইতিবাচক। ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক অনিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ব্যাংকের আমানত ও অন্যান্য হিসাবের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের জুন শেষে নেমে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ১৭১ কোটি টাকায়। এদিকে অন্যান্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এজেন্টদের কাছ থেকে ব্যাংকের ধার ডিসেম্বরে ছিল তিন হাজার ৩০৭ কোটি টাকা, যা জুন শেষে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার পাঁচ কোটি টাকায়।

এই ধার বৃদ্ধির একটি বড় অংশ এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থেকে। ব্যাংকের হিসাবে, দেশের ভেতরে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ধার ডিসেম্বরের দুই হাজার ৩১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জুনে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ২৪ কোটি টাকায়। এর মধ্যে রফতানি খাতের জন্য নির্ধারিত এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে নেয়া অর্থ ৯০৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৯১ কোটি টাকা।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কনসোলিডেটেড হিসাবে ব্যাংকের পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ হয়েছে ঋণাত্মক এক হাজার ১০২ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ইতিবাচক দুই হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে প্রায় তিন হাজার ৫৪৩ কোটি টাকার অবনতি হয়েছে। শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহও ২৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে কমে ঋণাত্মক ১০ টাকা ৪৩ পয়সায় নেমেছে। ব্যাংকের কনসোলিডেটেড ক্যাশ ফ্লো বিবরণী অনুযায়ী, গ্রাহকের আমানত থেকে ছয় হাজার ২২৯ কোটি টাকা বেরিয়ে যাওয়া এবং গ্রাহকদের দেয়া ঋণ-অগ্রিমের কারণে অতিরিক্ত অর্থ বের হওয়া এই ঘাটতির প্রধান কারণ।

এই ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংককে অন্য ব্যাংক থেকে ধার করে নগদ সংগ্রহে বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে এভাবে প্রায় এক হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা নগদ এসেছে, অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই খাত থেকে বরং ৬৫৫ কোটি টাকার বেশি নগদ বেরিয়ে গিয়েছিল। ব্যাংকের হাতে থাকা নগদ ও নগদ সমতুল্য অর্থও জুন শেষে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, গত বছরের একই সময়ে যা ছিল তিন হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা।

জুন শেষে ঢাকা ব্যাংকের মোট ঋণ, অগ্রিম, লিজ ও বিনিয়োগসহ ঋণসম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা, ডিসেম্বর শেষে যা ছিল ২৭ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিলস পারচেজড অ্যান্ড ডিসকাউন্টেড- অর্থাৎ গ্রাহকের বিল আগাম নগদ করে দেয়ার সুবিধা- উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৩৪৮ কোটি টাকা থেকে হয়েছে প্রায় এক হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। তবে সাধারণ ঋণ, ক্যাশ ক্রেডিট ও ওভার ড্রাফটসহ মূল ঋণপোর্টফোলিও ডিসেম্বরের ২৭ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে জুনে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকায়।

ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ, যার বড় অংশ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে, ডিসেম্বরের ১১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা থেকে কমে জুনে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২০০ কোটি টাকায়। অন্যদিকে মোট সম্পদ ডিসেম্বরের ৪৪ হাজার ৫২১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জুনে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫২২ কোটি টাকায়, তবে এর বিপরীতে মোট দায়ও বেড়েছে।

মুনাফা কমেছে ১৫ শতাংশের বেশি

আয়ের দিক থেকে ব্যাংকটি মুনাফায় থাকলেও তা কমেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে প্রায় ৯৩ কোটি টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল প্রায় ১১০ কোটি টাকা- অর্থাৎ কমেছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বা ১৫ শতাংশের বেশি। কনসোলিডেটেড হিসাবে নিট মুনাফা আগের বছরের প্রায় ১১৫ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়েও (ইপিএস)- একক হিসাবে তা ১ টাকা ৪ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৮৮ পয়সা, আর কনসোলিডেটেড ইপিএস ১ টাকা ৯ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ৯৫ পয়সা।

শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটিও ডিসেম্বরের দুই হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে জুনে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩৯৬ কোটি টাকায়। বিনিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন রিজার্ভে নেতিবাচক পরিবর্তন ও নগদ লভ্যাংশ প্রদানের প্রভাব এতে পড়েছে বলে আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে এবার প্রায় ২২৫ কোটি টাকা সংরক্ষণ করা হয়েছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল প্রায় ২৪৯ কোটি টাকা।

এসব চাপের মধ্যেও ঢাকা ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক বিবরণীতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারল্য, মুনাফা, সম্পদের গুণগত মান, প্রভিশন পর্যাপ্ততা ও মূলধন পর্যাপ্ততার মতো সূচকগুলো গত কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্যকর প্রবণতা দেখিয়েছে। ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি রেটিং এএ প্লাস এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং এসটি-১ বলেও উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (এমডি ও সিইও) ওসমান এরশাদ ফয়েজের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সব মিলিয়ে ঢাকা ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক হিসাবে দুই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে ব্যাংক মুনাফা করেছে ও মোট সম্পদ বেড়েছে, অন্যদিকে আমানত কমেছে, বাইরের উৎস থেকে ধার বেড়েছে এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে। আমানত বৃদ্ধির গতি ফিরিয়ে আনা এবং পরিচালন কার্যক্রম থেকে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করা তাই ব্যাংকটির জন্য আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।