অব্যাহত নিম্নমুখী প্রবণতায় চাপে দেশের রফতানি খাত

বৈশ্বিক মন্দা ও নীতিগত সহায়তার অভাবে গভীর হচ্ছে সঙ্কট

টানা কয়েক মাস ধরে রফতানি আয়ে নেই কোনো প্রবৃদ্ধি। কোনো কোনো মাসে তা সরাসরি নিম্নমুখী। তৈরী পোশাকসহ প্রধান রফতানি খাতগুলোতে অর্ডার কমে যাওয়া, মূল্যচাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ডলার সঙ্কট, ব্যাংকিং জটিলতা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রফতানি খাত এখন বহুমুখী চাপে রয়েছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশের রফতানি খাত আবারো চাপের মুখে। টানা কয়েক মাস ধরে রফতানি আয়ে নেই কোনো প্রবৃদ্ধি। কোনো কোনো মাসে তা সরাসরি নিম্নমুখী। তৈরী পোশাকসহ প্রধান রফতানি খাতগুলোতে অর্ডার কমে যাওয়া, মূল্যচাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা দুর্বল হওয়ার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর সাথে যোগ হয়েছে ডলার সঙ্কট, ব্যাংকিং জটিলতা, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব মিলিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রফতানি খাত এখন বহুমুখী চাপে রয়েছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে মোট রফতানি আয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে কিছুটা পুনরুদ্ধারের আভাস দেখা গিয়েছিল, সেখানে এবার প্রবৃদ্ধি মন্থর। তৈরী পোশাক খাত, যা দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়, সেখানেই মূল ধাক্কা লেগেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অর্ডার কমেছে, পাশাপাশি ক্রেতারা দাম কমাতে চাপ দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে রফতানি আয় বাড়লেও মুনাফা কমে যাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে রফতানি আয়ই কমে গেছে।

তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে জুলাই মাসে রফতানি আয় ছিল প্রায় ৪.৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে প্রায় ২৪.৯ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি একক মাস হিসেবে দেশে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ছিল। এ দিকে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে রফতানি আয় হয়েছে ৩.৯১ বিলিয়ন ডলার, যা এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে ২.৯৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট রফতানি আয় হয়েছে ২৩.৯৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.১৯ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরকে শেষে দেশে মোট রফতানি আয় হয়েছিল ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার; যা আগের বছরের তুলনায় ৮.৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েক মাস ধরে আমাদের রফতাানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কহার সারা বিশ্বের রফতানি বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও, যেখানে আমাদের রফতানি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খাচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ছাড়া ভারত ও চীনসহ যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ওই বাজারে রফতানি করতে পারছে না, তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রফতানির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে তারা মূল্য কমিয়ে দিয়ে পোশাক রফতানির অর্ডার নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশী রফতানিকারকরা একই ধরনের পণ্যের অর্ডার নিতে পারছেন না। ফলে ইউরোপীয় বাজারেও রফতানি কমছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি রফতানি খাতের এই চাপের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে উচ্চ সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি ও ভোক্তা ব্যয়সঙ্কোচনের কারণে পোশাক ও ভোক্তাপণ্যের চাহিদা কমেছে। বড় ব্র্যান্ড ও রিটেইলাররা আগের মতো বড় অর্ডার দিচ্ছেন না, বরং ছোট ছোট অর্ডার দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এর ফলে কারখানাগুলোর উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

তারা বলছেন, দাম নিয়ে চাপ রফতানিকারকদের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় ক্রেতারা কম দামে পণ্য নিতে চাইছেন। ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারায় বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ দেশে উৎপাদন ব্যয় কমেনি; বরং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, জ্বালানি ও গ্যাসের দাম, পরিবহন খরচ এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েছে। ফলে অনেক রফতানিকারক অল্প মুনাফায় বা কখনো লোকসান দিয়েও অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

দেশের পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (বাবু) বলেন, আমাদের সরকার আইএমএফ কর্মসূচি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের যুক্তি দেখিয়ে রফতানি খাতের নগদ সহায়তাসহ নানা সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যে সামান্য সহায়তা অবশিষ্ট ছিল, তার মেয়াদও ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। সেটি নবায়নের জন্য আমরা ইতোমধ্যে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি, যা রফতানিকারকদের টিকে থাকতে সহায়তা করবে; অন্যথায় রফতানি বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, সাধারণত যেকোনো জাতীয় নির্বাচনের আগে আমাদের রফতানি আদেশ কিছুটা কমে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তবে নির্বাচনের পর সরকার যদি শিল্পসংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আগামী জুনের পর থেকে রফতানি আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারে। তিনি বলেন, ডলার সঙ্কট ও ব্যাংকিং খাতের জটিলতাও রফতানি খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতে গিয়ে বিলম্ব হচ্ছে, সময়মতো ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন চক্র ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক রফতানিকারক অভিযোগ করছেন, রফতানি আয় দেশে আনার পরও ব্যাংকে টাকা পেতে দেরি হচ্ছে, যা তাদের চলতি মূলধন সঙ্কটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রফতানির পরিসংখ্যান বলছে, তৈরী পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের রফতানি আয় স্থবির বা নিম্নমুখী। কিছু খাতে বাজার বৈচিত্র্য কম থাকায় নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে চাহিদা কমলেই পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার অগ্রগতি সীমিত।

নীতিগত অনিশ্চয়তাও রফতানি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে নগদ সহায়তা ও প্রণোদনা নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। অনেক রফতানিকারক জানেন না, ভবিষ্যতে কী ধরনের সহায়তা পাবেন বা কোনো শর্তে রফতানি করতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে তারা দ্বিধায় পড়ছেন। পাশাপাশি কর ও শুল্ক নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।

লজিস্টিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রফতানি খাতের প্রতিযোগিতা কমাচ্ছে। বন্দরে কনটেইনার জট, পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন সমস্যার কারণে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়, যা ভবিষ্যৎ অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শ্রম পরিস্থিতি ও উৎপাদনশীলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মজুরি বৃদ্ধির পরও উৎপাদনশীলতা কাক্সিক্ষত হারে বাড়েনি বলে শিল্প উদ্যোক্তারা অভিযোগ করছেন। প্রশিক্ষিত শ্রমিকের অভাব, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রফতানি খাতের বর্তমান সঙ্কট শুধু সাময়িক নয়; এর মধ্যে কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা একসময় কাটলেও যদি দেশীয় সমস্যাগুলো সমাধান না করা যায়, তাহলে রফতানি পুনরুদ্ধার টেকসই হবে না। ডলার ব্যবস্থাপনা সহজ করা, ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা বাড়ানো, লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।

একই সাথে নতুন বাজার ও নতুন পণ্যের দিকে নজর দেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান বাজারে প্রবেশ, প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রফতানি খাত নতুন গতি পেতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নমুখী রফতানি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সঙ্কেত। বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমলে আমদানি, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে। তাই রফতানি খাতের এই চাপকে শুধু বৈশ্বিক মন্দার অজুহাতে এড়িয়ে না গিয়ে, কাঠামোগত সংস্কার ও কার্যকর নীতিগত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত মোকাবেলা করা জরুরি। না হলে রফতানি খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতিতেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে বলে তারা মনে করছেন।