পদ্মা-যমুনায় কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ

কাজে আসছে না ৫ কোটি টাকার ফগ লাইট

ঘন কুয়াশায় নিয়মিতভাবে বন্ধ হয়ে যায় ফেরি চলাচল, ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রী ও যানবাহন। নৌপথে এই ভোগান্তি কমাতে প্রায় এক দশক আগে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে ফেরিতে স্থাপন করা হয় ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট। সেসব ফগ লাইট এখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এম মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী
Printed Edition
কাজে আসছে না ৫ কোটি টাকার ফগ লাইট
কাজে আসছে না ৫ কোটি টাকার ফগ লাইট

রাজধানী ঢাকার সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার একমাত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নৌ-প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট। কিন্তু শীত মৌসুম এলেই এই নৌরুটে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। ঘন কুয়াশায় নিয়মিতভাবে বন্ধ হয়ে যায় ফেরি চলাচল, ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রী ও যানবাহন। নৌপথে এই ভোগান্তি কমাতে প্রায় এক দশক আগে পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে ফেরিতে স্থাপন করা হয় ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট। সেসব ফগ লাইট এখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী ১০টি ফেরিতে পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ফগ অ্যান্ড সার্চ লাইট স্থাপন করে। উদ্দেশ্য ছিল শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশার মধ্যেও নিরাপদে ফেরি চলাচল চালু রাখা। সে সময় প্রকল্পটি নিয়ে বড় ধরনের আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে এক দিনের জন্যও এই আলো কার্যকরভাবে নৌপথ দেখাতে পারেনি বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় বাসিন্দা, ফেরি মাস্টার ও যানবাহন চালকদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ভাইয়ের ঠিকাদারিতে স্থাপিত এসব ফগ লাইট শুরু থেকেই মানহীন ছিল। অল্পসময়ের মধ্যেই সেগুলো বিকল হয়ে পড়ে। অনেকের দাবি, ফগ লাইটগুলো কখনোই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা যায়, একেকটি ফেরিতে স্থাপন করা সাড়ে সাত হাজার কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিটি ফগ লাইটের ক্রয়মূল্য ছিল অর্ধকোটি টাকারও বেশি। তবে স্থাপনের পর থেকেই এসব লাইট বিকল হয়ে পড়ে এবং এখনো সেগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

চলতি শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশার কারণে অন্তত ১২০ ঘণ্টা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। এতে উভয় ঘাটে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স ও পণ্যবাহী যানসহ হাজারো যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়ে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন রোগী বহনকারী যান ও জরুরি সেবার সাথে সংশ্লিষ্টরা।

যানবাহন চালকদের ভাষ্য, কুয়াশা সামান্য ঘন হলেই ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ পাঁচ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বসানো ফগ লাইট কার্যকর থাকলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল না।

এ দিকে ফগ লাইট অকার্যকর থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায় নিতে নারাজ। বিআইডব্লিউটিসি ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা গেছে। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক মো: সালাহউদ্দিনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্য দিকে মো: সালাহউদ্দিন বলেন, ‘ফগ লাইটের বিষয়টি মূলত কারিগরি বিভাগের আওতাভুক্ত। দৌলতদিয়া প্রান্তে এ সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র বা ফাইল নেই। আমার কাছে দেয়ার মতো কোনো তথ্যও নেই।’ কারিগরি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই কুয়াশায় ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। দৃশ্যমানতা শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেলে ফেরি চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।’ নিয়মিত এক যাত্রী বলেন, ‘প্রতিবার শীত এলেই একই নাটক। কোটি টাকা ব্যয়ের কথা শুধু কাগজে আছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। টাকাগুলোই শুধু হাওয়া করে ফেলা হয়েছে।’

বিআইডব্লিউটিসির তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন এই নৌরুট দিয়ে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। ফলে ফেরি চলাচল বন্ধ মানেই অর্থনীতি, চিকিৎসাসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নৌপথ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রুটে আধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম, কার্যকর ফগ লাইট কিংবা বিকল্প প্রযুক্তি চালু করা জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতার অভাবে বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলছে।

যাত্রী, চালক ও স্থানীয়দের দাবি- অকার্যকর ফগ লাইট প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতে নিয়ে আসা এবং দ্রুত মেরামতের মাধ্যমে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ফেরি চলাচল চালু রাখা হোক। নচেৎ প্রতি শীত মৌসুমেই এই নৌরুটে অচলাবস্থা ও দুর্ভোগ অনিবার্য হয়ে পড়বে। রাজস্ব আয়েও পড়বে এর নেতিবাচক প্রভাব।