মার্কিন প্রস্তাব পর্যালোচনায় থাকলেও আলোচনায় বসতে নারাজ ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান ট্রাম্পের
  • ইসরাইলের পারমাণবিক স্থাপনায় আইআরজিসির হামলা
  • আইআরজিসি নৌ-প্রধানের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা
  • হরমুজে নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের লঙ্ঘন : জিসিসি

মধ্যপ্রাচ্যে গত চার সপ্তাহ ধরে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া একটি শান্তি প্রস্তাব বর্তমানে তেহরানের টেবিলে রয়েছে। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করলেও ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি কোনো আলোচনায় বসেনি। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি চুক্তির জন্য ‘মরিয়া’ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মাঝেই আকাশচুম্বী জ্বালানি তেলের দাম এবং মানবিক সঙ্কটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। তারা যেকোনো শান্তি চুক্তির আগে ভবিষ্যৎ সামরিক হামলার নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একক নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। এ ছাড়া যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও তারা মধ্যস্থতাকারীদের চাপ দিচ্ছে।

ট্রাম্পের দাবি বনাম ইরানের অবস্থান : বুধবার ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “ইরানি নেতারা ভেতরে ভেতরে আলোচনার টেবিলে রয়েছেন এবং তারা একটি চুক্তি করতে প্রচণ্ড আগ্রহী। কিন্তু নিজেদের জনগণের ক্ষোভ এবং আমাদের আক্রমণের ভয়ে তারা এটি প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারছেন না।”

রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদান এবং আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করাকে কোনোভাবেই ‘আলোচনা’ বা ‘সংলাপ’ বলা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সরাসরি কোনো সংলাপ হয়নি।”

ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে, দেরি করলে পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় এই ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাবটি ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, দ্রুত কোনো সমঝোতায় না পৌঁছলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান মানবিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। বর্তমানে পুরো বিশ্ব ইরানের চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা ইরানের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে একটি উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত আধিপত্যবাদী ও অযৌক্তিক।

মধ্যস্থতায় মিসরের অংশগ্রহণ : মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেল আত্তি জানিয়েছেন, কায়রো বর্তমানে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করছে। বর্তমানে লেবানন সফরে থাকা এই মন্ত্রী দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি স্থল অভিযান বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইসরাইলের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি অবিলম্বে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইরানের পদক্ষেপ নিয়ে জিসিসির ভাষ্য : উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) মহাসচিব জসিম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বলেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং সেখানে ফি আরোপের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘন করেছে। তিনি একে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে বলেন, জিসিসি দেশগুলো বিশ্বের অর্থনৈতিক ফুসফুস, যারা বিশ্ব উৎপাদনের ২২ শতাংশ খনিজ তেল সরবরাহ করে। ইরানের এই আগ্রাসন বিশ্ব নৌ-চলাচল ও অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

জিসিসি প্রধান আরো অভিযোগ করেন যে, ইরান উদ্দেশ্যমূলকভাবে জিসিসি দেশগুলোর বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। এই হামলায় অনেক সাধারণ নাগরিক ও বাসিন্দা নিহত হয়েছেন। তিনি এই পরিস্থিতিকে ইরান ও জিসিসি দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক ‘মোড়’ বা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ইসরাইলের পারমাণবিক অবকাঠামোতে হামলা : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের ৮২তম ধাপ শুরু করেছে। তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আজ ভোরে শুরু হওয়া এই অভিযানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ইসরাইলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং মৃত সাগরের (ডেড সি) দক্ষিণে অবস্থিত পারমাণবিক অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চল লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে।

মধ্য ইসরাইলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহত : ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্য ইসরাইল ও তেলাবিবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইসরাইলি চ্যানেল ১২ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন একটি গাড়ির ছবি প্রকাশ করেছে। জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা জানিয়েছে, তেলাবিবে ক্ষেপণাস্ত্রের স্পিøন্টারের আঘাতে একজন নারীসহ অন্তত দুইজন আহত হয়েছেন।

জর্দানে ৩টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত : জর্দানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইরান তাদের লক্ষ্য করে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যার সবই জর্দান বিমানবাহিনী ভূপাতিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কিছু বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

আইআরজিসি নৌ-প্রধানের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা : ইসরাইল দাবি করেছে তারা আইআরজিসির নৌ-কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরিকে হত্যা করেছে। ইরান এখনো এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তবে তাংসিরির মৃত্যু সত্য হলে এটি ইরানের জন্য এক বিশাল ধাক্কা হবে। কারণ তিনি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে প্রণালি বন্ধের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।

ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৯৩৭ : ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফারিয়ান আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে অন্তত ১,৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ২৪০ জন নারী এবং ২১২ জন শিশু রয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছেন প্রায় ২৪ হাজার ৮০০ জন, যার মধ্যে ৪,০০০ নারী ও ১,৬২১ জন শিশু রয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা : কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও রণক্ষেত্রে সঙ্ঘাতের তীব্রতা কমেনি। বৃহস্পতিবার ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস এবং শিরাজ শহরে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় দুই কিশোরসহ বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, পাকিস্তানের অনুরোধে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফকে তাদের ‘হিট-লিস্ট’ থেকে সাময়িকভাবে বাদ দিয়েছে ইসরাইল। পাকিস্তান ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেছিল যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা হলে কথা বলার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

জ্বালানি সঙ্কটের কালো মেঘ : হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আবুধাবির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি এনডকের প্রধান নির্বাহী সুলতান আল জাবের ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধ যদি জুন মাস পর্যন্ত গড়ায়, তবে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়বে।

জনমত ও ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ : একটি রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, ৬১ শতাংশ আমেরিকান ইরানে মার্কিন সামরিক হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সামনেই নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন, আর এর মধ্যে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও শেয়ার বাজারের মন্দা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক চাপ সামলাতে ট্রাম্প একটি দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজছেন।

বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক লড়াই বিশ্বকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ইসলামাবাদ এগিয়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি।