দেশের ব্যাংকিং খাতে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের চাপ কমানো এবং স্থবির হয়ে পড়া শিল্প খাতে গতি ফেরাতে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনহীন পড়ে থাকা এসব শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে, অন্য দিকে ব্যাংক খাতের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের পথও সৃষ্টি হবে।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ঋণের এমন উচ্চ খেলাপি হার দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বন্ধ ও রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব শিল্প চালুর ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা হবে এবং পুরনো শ্রমিকদের পুনর্বহাল করার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সঙ্কটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকে সচল না করলে খেলাপি ঋণের বোঝা কমানো কঠিন হবে। বন্ধ কারখানাগুলো চালু করতে পারলে উৎপাদন শুরু হবে, আয় বাড়বে এবং ধীরে ধীরে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হবে, এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
এ দিকে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এই কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করছে এবং সেগুলো পুনরায় চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। তবে মালিকানা কাঠামো, বিনিয়োগের ধরন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও তারা কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরছেন। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, অনেক কারখানা শুধু আর্থিক সঙ্কটে নয় বরং বাজার সঙ্কট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং জ্বালানি সমস্যার কারণেও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু কারখানা চালু করলেই তা টেকসই হবে না।
তিনি বলেন, করোনাকাল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে অনেক উদ্যোক্তা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে এসব উদ্যোক্তার জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল, স্বল্পসুদে নতুন ঋণ এবং নীতিগত সহায়তা দেয়া জরুরি। একইসাথে যদি সরকার বন্ধ শিল্পগুলো বেসরকারি খাতের কাছে হস্তান্তর করতে চায়, তাহলে পুরনো দায়দেনা ও ঋণের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) তাসকিন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ধ শিল্প চালু করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না; এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নীতিমালা, আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার।
তিনি বলেন, সরকার এখন খেলাপি শিল্পঋণকে ‘অ্যাসেট রিকভারি’ বা সম্পদ পুনরুদ্ধারের অংশ হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ বন্ধ শিল্পগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে পারলে সেগুলো থেকে আয় তৈরি হবে এবং সেই আয় থেকেই ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে। এতে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ। শিল্প মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যাপ্ত অর্থ ছাড় না থাকায় তা বাস্তবায়ন থমকে আছে। বিভিন্ন পর্যায়ে বরাদ্দ চাওয়া হলেও এখনো অনুমোদন না পাওয়ায় মিলগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
শুধু অর্থ সঙ্কটই নয়, জনবল সঙ্কটও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় অনেক কম কর্মী রয়েছে। দক্ষ প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও ব্যবস্থাপনা জনবল না থাকলে এসব শিল্প সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ ছাড়া অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ের পদ শূন্য থাকায় কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থায়ী নিয়োগ না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান শুধু শিল্প চালুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি হওয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। তা না হলে নতুন করে ঋণ দিলেও একই সমস্যা পুনরায় দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগটি অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন কৌশল, নীতিগত সমর্থন এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে এবং দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের চাপ কিছুটা হলেও কমাতে সক্ষম হবে বলে তিনি মনে করেন।



