- উদ্ধার হয়নি দেড় হাজার অস্ত্র, পৌনে তিন লাখের বেশি গোলাবারুদ
- ভারী অস্ত্র দুই লাখ, ছোট অস্ত্র গোলাবারুদের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ক্যাম্প ও সরকারি স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। র্যাব ফোর্সেসের একটি অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয় নথি অনুযায়ী দুই বছর পার হলেও প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র এবং পৌনে তিন লাখেরও বেশি গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে গেছে। সন্ত্রাসীরা সেই অস্ত্র গোলাবারুদই ব্যবহার করছে টার্গেট কিলিং বা প্রতিপক্ষসহ সন্ত্রাসী কাজে। এর ফলে খুনোখুনি ও অপরাধ প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিরাপত্তার জন্য চরম উদ্বেগের। এসব বিষয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি সমন্বয় কমিটি গঠনের অনুমতি দেয়া হয়। কমিটির প্রধান সংস্থা হিসেবে অনুমোদন করা হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সদর দফতরকে।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট র্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে হারানো সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে যৌথ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের লক্ষ্যে এক বিশেষ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। র্যাব ফোর্সেসের অতিরিক্ত আইজিপি মো: আহসান হাবীব পলাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় পুলিশ, র্যাব, এনএসআই, ডিজিএফআই, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, স্বরাষ্ট্র গোয়েন্দা শাখা (এসবি), পুলিশ সদর দফতর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ড, এসএসএফ, আনসার-ভিডিপি, ফায়ার সার্ভিস ও কারা অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের কার্যবিবরণীর একটি অনুলিপি নয়া দিগন্তের হাতে এসেছে।
নথিতে উল্লিখিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন বাহিনী থেকে সর্বমোট পাঁচ হাজার ৯৪২টি অস্ত্র খোয়া যায়; যার মধ্যে চার হাজার ৫১৫টি উদ্ধার হয়েছে এবং এক হাজার ৪২৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।
বাহিনীভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র হারিয়েছে পুলিশ- পাঁচ হাজার ৫৯৫টি অস্ত্রের মধ্যে চার হাজার ৩৬২টি উদ্ধার হলেও এক হাজার ২৩৩টি এখনো উদ্ধার হয়নি। এ ছাড়া র্যাবের হারানো ১৬৮টি অস্ত্রের মধ্যে ৭৭টি, কারা অধিদফতরের ৯৪টির মধ্যে ৩২টি এবং আনসার বাহিনীর হারানো ৭৭টি অস্ত্রের একটিও উদ্ধার হয়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
গোলাবারুদের ক্ষেত্রে চিত্র আরো উদ্বেগজনক। মোট ছয় লাখ ৮৩ হাজার ৩৫৫ রাউন্ড গোলাবারুদ হারানোর তথ্য নথিতে রয়েছে, যার একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করতে পারেনি।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে এককভাবে সবচেয়ে বেশি গোলাবারুদ হারিয়েছে পুলিশ। ছয় লাখ ৫২ হাজার আট রাউন্ডের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৫৭ হাজার এখনো উদ্ধার হয়নি। র্যাবের হারানো ১২ হাজার ৪৬৯ রাউন্ডের মধ্যে পাঁচ হাজার ১৮৫ রাউন্ড এখনো উদ্বার করতে পারেনি।
ওই সভায় সভাপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হারানো অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে সমন্বিত কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক। তিনি সব বাহিনী ও সংস্থাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দেন।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, র্যাব ফোর্সেস সদর দফতরে একটি কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা তথ্য আদান-প্রদান করবে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র-গোলাবারুদ ও আসামিদের গ্রেফতারসংক্রান্ত তথ্য দৈনিক ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে হালনাগাদ করা হবে। এ ছাড়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেসব এলাকা থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ হারিয়ে গেছে, সেসব এলাকা চিহ্নিত (হটস্পট ম্যাপিং) করে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধী শনাক্তেরও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে অস্ত্র-গোলাবারুদ কেনাবেচার প্রবণতা রয়েছে বলে সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ জন্য সাইবার মনিটরিং জোরদার এবং ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অস্ত্র লেনদেন ঠেকাতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মেটাল ডিটেক্টর ও ডগ স্কোয়াডের মাধ্যমে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানোরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। জলাশয়ে অস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় অতিরিক্ত তল্লাশি চালানোর নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
হারানো অস্ত্র উদ্ধারে উৎসাহ দিতে পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে যে কেউ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হারানো অস্ত্র সমর্পণ করলে তার পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে না।
পুরস্কারের হার নির্ধারণ করা হয়েছে- রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি ও স্নাইপারের জন্য প্রতিটি দুই লাখ টাকা; শটগান, পিস্তল ও গ্যাসগানের জন্য প্রতিটি ৫০ হাজার টাকা; সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেলের জন্য প্রতিটি দেড় হাজার টাকা এবং প্রতি রাউন্ড গোলাবারুদের জন্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নিজস্ব সদস্যরাও এই পুরস্কারের আওতায় থাকবেন বলে সিদ্ধান্তে উল্লেখ রয়েছে।
সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রতি ১৫ দিন পরপর উদ্ধারসংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন সব বাহিনী ও সংস্থার কাছে পাঠাবে র্যাব ফোর্সেস সদর দফতর। সভা শেষে এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অবহিত করে চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, এনএসআইয়ের মহাপরিচালক এবং সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের মহাপরিচালকের কাছে।
‘গোপনীয়’ চিহ্নিত এ নথিটি সভা শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং তা মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্তও হয়েছে বলে নয়া দিগন্তের হাতে আসা কাগজপত্রে দেখা গেছে। সভায় আলোচনার মধ্যে ছিল দুই বছরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষত এসব অস্ত্র অপরাধী চক্র বা চোরাকারবারিদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
জনসাধারণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতারা, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক সমাজ, আনসার-ভিডিপি সদস্য, চৌকিদার ও দফাদারসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ‘হোল অব সোসাইটি অ্যাপ্রোচ’ ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অস্ত্র উদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তথ্যদাতাদের জন্য চারটি হটলাইন নম্বর চালু করেছে র্যাব ফোর্সেস- ০১৭৭৭৭১১৮৮১, ০১৭৭৭৭১১৮৮২, ০১৭৭৭৭১১৮৮৩ ও ০১৭৭৭৭১১৮৮৮। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছাড়াও হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টেলিগ্রাম ও ভাইবারের মাধ্যমেও এসব নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।



