‘ক্লুলেস’ ছবির যে গোপন দিক আপনাকে বারবার টানবে

Printed Edition
‘ক্লুলেস’ ছবির যে গোপন দিক আপনাকে বারবার টানবে
‘ক্লুলেস’ ছবির যে গোপন দিক আপনাকে বারবার টানবে

সাকিবুল হাসান

১৯৯৫ সালের ১৯ জুলাই মুক্তি পেয়েছিল একটি হালকা ধাঁচের কিশোর-কিশোরীর জীবনকেন্দ্রিক হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্র ‘ক্লুলেস’। মুক্তির সময় কেউই ভাবেনি এই ছবি একদিন হয়ে উঠবে পুরো একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র। অথচ ৩০ বছর পরও সিনেমাটির চরিত্র, সংলাপ, পোশাক কিংবা আবহাওয়া দর্শকের মনে একই রকম রঙ ছড়ায়। সময় পেরিয়ে গেলেও ‘চের হরোভিৎস’ আজো সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অমলিন এক নাম। কারণ এই ছবি শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল আত্মপরিচয়ের খোঁজ, নারীবাদ, বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার এক অনবদ্য উপাখ্যান।

পরিচালক অ্যামি হেকারলিংয়ের ভাবনায় গড়ে ওঠা এই গল্পের মূল চরিত্র ‘চের’ একজন বিত্তশালী, স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী কিশোরী, যার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হতো পোশাক বাছাই করা বা বন্ধুর প্রেমজটিলতা মিটিয়ে দেয়া। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে দর্শক বুঝেছে, ‘চের’ কেবল ফ্যাশন ও বাহ্যিকতায় আটকে থাকা একটি মেয়ে নয়; বরং ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন দয়ার্দ্র, পরিণত এবং শেখার আগ্রহে পূর্ণ এক মানবিক চরিত্র। তার জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, ভুল আর সংশোধনের মধ্য দিয়েই সিনেমাটি তুলে ধরে আত্ম-উন্নয়নের পথ। এই ছবির সাফল্যের পেছনে যেমন ছিল নিখুঁত অভিনয়, চমৎকার চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলী, তেমনি ছিল অনেক অজানা ও বিস্ময়কর ঘটনা, যা আজো অনেকের অজানা।

এই চলচ্চিত্রের নাম কী হবে, তা নিয়ে শুরুতে ছিল দ্বিধা। ‘নো ওয়রিস’ কিংবা ‘আই ওয়াজ আ টিনএজ টিনএজার’ নামগুলো বিবেচনায় এলেও শেষ পর্যন্ত ‘ক্লুলেস’ নামটিই চূড়ান্ত হয়। এই নামই যেন সবচেয়ে ভালোভাবে ধারণ করে সিনেমার ভাবনা ও চরিত্রগুলোর অবস্থান। চের চরিত্রের জন্য পরিচালক প্রথম থেকেই ভাবছিলেন অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোনকে। অ্যারোস্মিথ ব্যান্ডের একটি গানের ভিডিওতে অ্যালিসিয়ার পারফরম্যান্স দেখে এতটাই মুগ্ধ হন হেকারলিং যে চিত্রনাট্যের সাথে সেই ভিডিওর কপি জমা দেন প্রযোজকদের কাছে। কিন্তু স্টুডিওর ইচ্ছা ছিল আরো অভিনেত্রীকে দেখে নেয়ার। এই তালিকায় ছিলেন রিজ উইদারস্পুন, গুইনেথ প্যাল্ট্রো, কেরি রাসেলসহ আরো অনেকে। শেষ পর্যন্ত পরিচালক দৃঢ়তার সাথে জানিয়ে দেন, ‘অ্যালিসিয়া-ই চের’।

জশ চরিত্রে যাকে দেখা যায় অভিনেতা পল রাডকে, তিনি ছিলেন চূড়ান্ত পছন্দের বাইরে। শুরুতে অন্য একজনকে নেয়ার পরিকল্পনা করা হলেও তা ব্যর্থ হলে আবার ফিরিয়ে আনা হয় রাডকে। বহু অডিশনের পর তাকেই বেছে নেয়া হয়। মজার ব্যাপার- পল রাড প্রথমে ‘মারে’ চরিত্রে অডিশন দিতে চেয়েছিলেন, কারণ তিনি ভেবেছিলেন সেটি একজন শ্বেতাঙ্গ চরিত্রের ভূমিকা। পরে বুঝতে পারেন, চরিত্রটি একজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের জন্য লেখা।

চেরের একতরফা প্রেমিক ক্রিশ্চিয়ানের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বহু অভিনেতাকে দেখা হলেও কেউই ঠিকভাবে পছন্দ হচ্ছিল না পরিচালকের। একসময় নিউইয়র্ক থেকে অডিশনে আসেন নবাগত অভিনেতা জাস্টিন ওয়াকার। অল্প সময় প্রস্তুতির সুযোগ পেলেও তার উপস্থিতিই পরিবর্তন এনে দেয় দৃশ্যপটে। এমনকি অভিনয়ের খবর পাওয়ার পর তিনি আনন্দে রাস্তায় দৌড়ে বেড়ান- এমনই তথ্য পাওয়া গেছে তার এক সাক্ষাৎকার থেকে।

অন্যদিকে, সিনেমার একটি উল্লেখযোগ্য দৃশ্য- যেখানে চেরকে বন্দুক ঠেকিয়ে ছিনতাই করা হয়, সেই দৃশ্যের জন্য নির্ধারিত অভিনেতা শুটিংয়ের ঠিক আগ মুহূর্তে কাজ ছেড়ে চলে যান। মোবাইল ফোন না থাকায় পরিচালক তখন হন্তদন্ত হয়ে ফোন করতে থাকেন বিভিন্ন অফিসে। শেষ পর্যন্ত জেস আলেকজান্ডার নামের এক অভিনেতাকে পাওয়া যায় যিনি মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে অভিনয়ে সম্মত হন। ট্রাভিস চরিত্রে অভিনয় করা ব্রেকিন মায়ারের জীবন এই সিনেমার মধ্য দিয়েই পাল্টে যায়। সে সময় তিনি ছিলেন প্রায় দেউলিয়া, একটি গ্যারাজের ওপর ছোট্ট কক্ষে থাকতেন, বিছানা তো দূরের কথা, গরম পানিও ছিল না। সিনেমার কাজ পাওয়ার পর যেন তার জীবনের অন্ধকারে আলো জ্বলে ওঠে।

মজার ব্যাপার- বাস্তব জীবনের অ্যালিসিয়া চেরের মতো ফ্যাশন সচেতন ছিলেন না। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি প্রায় প্রতিদিনই একই সবুজ টি-শার্ট আর জিনস পরতাম। এত পোশাক বদলানো আমার স্বভাবে ছিল না।’ অথচ সিনেমার দৈর্ঘ্য ১০০ মিনিট হলেও তাতে চেরেরর্ পোশাক বদলানো হয়েছিল অন্তত ৬৪ বার!

এই চলচ্চিত্রে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছিল নারীর আত্মবিশ্বাস, ভুল থেকে শেখা এবং সম্পর্কের জটিলতা। চের হরোভিৎস সেই কিশোরী, যিনি একদিকে যেমন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত, তেমনি সমাজে ভালো কিছু করার চেষ্টাও চালিয়ে যান। তার চরিত্র যেন আমাদের শেখায়-ভুল করাও শেখার অংশ, আর বাহ্যিক আভরণেই সব কিছু বিচার করা ঠিক নয়।

বর্তমানে সিনেমাটির জনপ্রিয়তা এতটাই স্থায়ী যে, নতুন প্রজন্মের কাছেও এটি প্রাসঙ্গিক। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চেরের সংলাপ, পোশাক ও স্টাইল নিয়ে ভিডিও বানান।

এমনকি অ্যালিসিয়া নিজেও মাঝে মধ্যে আবার চেরের পোশাকে আবির্ভূত হন অনলাইনে। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ এখনো এই ছবিকে ভালোবাসে।’ সিনেমা সমালোচকরা মনে করেন, এটি এমন একটি ছবি, যা আজো আমাদের কাছে রয়ে গেছে একই রকম প্রিয়, যেখানে হাস্যরসের আড়ালে ছিল অনেক শিক্ষা, অনেক অনুভব, তাকে স্মরণ না করে পারা যায় না। তাই হয়তো ৩০ বছর পরও, আমাদের হৃদয়ে বারবার ফিরে আসে চের হরোভিৎস, তার জগৎ, তার দ্বিধা আর তার ভালোবাসা।