৯ জাহাজ থেকে আটক দেড় শ’

ইসরাইলি বাহিনীর হাতে অপহৃত শহিদুল আলম

Printed Edition
ইসরাইলি নৌবাহিনীর হাতে আটকের পর বাংলাদেশী আলোকচিত্রী শহিদুল আলম : ইন্টারনেট
ইসরাইলি নৌবাহিনীর হাতে আটকের পর বাংলাদেশী আলোকচিত্রী শহিদুল আলম : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম গাজা অভিমুখী কনশেনস নামের যে জাহাজে আছেন সেটি ইসরাইলি নৌবাহিনী মাঝসমুদ্রে আটকে দেয়ার পর জাহাজটিতে অবস্থান নেয়া সবাইকে আটক করা হয়। শহিদুল আলম নিজেই এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, তিনিও অপহরণের শিকার হয়েছেন। ইসরাইলি নৌবাহিনী গতকাল বুধবার অন্তত ৯টি জাহাজ থেকে ১৫০ জনকে আটক করে বলে টাইমস অব ইসরাইলের একটি প্রতিবেদন জানিয়েছে। ওই ৯টি জাহাজের মধ্যে শহিদুল আলমদের বহন করা কনশেনস জাহাজটিও ছিল। হেলিকপ্টার থেকে ইসরাইলি নৌ সেনারা কনশেনস জাহাজটির ওপর নেমে আসে।

ইসরাইলি নৌবাহিনী ১৫০ জন কর্মীসহ ৯টি জাহাজকে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যায়। পুলিশ ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাদের নির্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিওবার্তায় শহিদুল আলম বলেছেন, ‘আমি শহিদুল আলম, বাংলাদেশের একজন আলোকচিত্রী ও লেখক। আপনারা যদি এই ভিডিও দেখে থাকেন, তাহলে শুনুন, আমাদের সাগরে আটকে দেয়া হয়েছে এবং আমাকে ইসরাইলের দখলদার বাহিনী অপহরণ করেছে। এরা সেই দেশের বাহিনী, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা নিয়ে গাজায় জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে আমি আমার সব সহযোদ্ধা ও বন্ধুর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল সোয়া ১০টার দিকে এই ভিডিওবার্তাটি পোস্ট করেন তিনি।

শহিদুল আলম কনশেনস নামের যে জাহাজে আছেন, তা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) ও থাউজেন্ড ম্যাডলিনস টু গাজা (টিএমটিজি) নৌবহরের একটি জাহাজ। আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও চিকিৎসাকর্মীবাহী এই জাহাজ ইসরাইলের অবৈধ অবরোধ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গাজা অভিমুখে রওনা হয়েছিল। এর আগে গত মঙ্গলবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শহিদুল বলেছিলেন, বুধবার ভোরে তারা রেড জোনে পৌঁছে যেতে পারেন। রেড জোন বলতে শহিদুল আলম মূলত সেই বিপজ্জনক অঞ্চলকে বুঝিয়েছেন, যেখানে ইসরাইলি সেনারা সম্প্রতি সুমুদ ফ্লোটিলা নৌবহরকে আটকে দিয়ে অধিকারকর্মীদের আটক করেন।

সুমুদ ফ্লোটিলা নৌবহরের নৌযানগুলোও ইসরাইলি অবরোধ ভেঙে গাজায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল।

এ দিকে টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সর্বশেষ গাজা নৌবহর আটকের পর ১৫০ জন কর্মীকে বহিষ্কারের প্রস্তুতি চলছে। নৌ কমান্ডোরা বিশাল যাত্রীবাহী জাহাজে উঠে পড়ে, ভূমধ্যসাগরে আরো আটটি পালতোলা নৌকার সবাইকে আটক করে। ইসরাইলি নৌবাহিনী ৪২টি জাহাজ আটক করার এক সপ্তাহ পর এ ঘটনাটি ঘটে, যা এখন পর্যন্ত গাজা অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য সবচেয়ে বড়। ইসরাইল এই নৌবহরে অংশ নেয়া ৪৭৯ জন কর্মীর বেশির ভাগকেই বহিষ্কার করেছে, যার মধ্যে সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গও রয়েছেন।

বুধবার সকালে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, গাজার ওপর সামুদ্রিক অবরোধ ভাঙার চেষ্টাকারী নতুন নৌবহরটিকে তার লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেয়া হয়েছে, এর জাহাজ ও যাত্রীদের আটক করে আশদোদ বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বুধবার ভোরবেলা ভূমধ্যসাগরে, গাজা উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ নটিক্যাল মাইল দূরে এই বাধার ঘটনা ঘটে। ৪০ মিনিটের মধ্যে শায়েতেত ১৩ নৌ কমান্ডো ইউনিট এবং অন্যান্য নৌবাহিনীর ৯টি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যার মধ্যে ৬৮ মিটার দীর্ঘ যাত্রীবাহী জাহাজ কনশেনস অন্তর্ভুক্ত ছিল। কনশেনসের আকারের কারণে নৌ কমান্ডোরা ইসরাইলি বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে জাহাজের ডেকে উঠে পড়ে।

এফএফসি জানিয়েছে, ‘বিশ্বজুড়ে মানবতাবাদী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণকারীদের তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং অজানা পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কোনো আইনি এখতিয়ার নেই।’

জাহাজগুলো গাজার হাসপাতালের জন্য ১১০,০০০ ডলারেরও বেশি মূল্যের ওষুধ, শ্বাসযন্ত্রের সরঞ্জাম এবং পুষ্টি সরবরাহ বহন করেছিল, এফসিসি তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দাবি করেছে।

দুই বছর ধরে চলমান যুদ্ধে ইসরাইল বিদেশী সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে বাধা দিয়ে আসছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলি হামলায় ২৭০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। অনেকে আটক হয়ে ইসরাইলি কারাগারে বন্দী আছেন।

শহিদুল আলমের প্রতি প্রেস সচিবের সহমর্মিতা

বাসস জানায়, বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বুধবার এক পোস্টে শফিকুল আলম লিখেছেন, হাসিনা সরকারের আমলে কারাবন্দী অবস্থায় যে অসাধারণ সাহস ও দৃঢ়তা শহিদুল দেখিয়ে ছিলেন, সেই মানসিক শক্তিই এবারো তাকে এই দুঃসময় পার হতে সহায়তা করবে। তিনি আরো বলেন, ‘শহিদুল আলমের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, তবে একই সাথে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার প্রতিও। এটি কেবল এক মানবিক বিপর্যয় নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক নৈতিক পরীক্ষাও।’

শহিদুল আলমসহ নৌবহরের সব যাত্রীর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান প্রেস সচিব। তার ভাষায়, ‘শহিদুল বাংলাদেশের অবিচল মানবিক চেতনার উজ্জ্বল প্রতীক।’ সবশেষে তিনি শহিদুল ও তার সঙ্গীদের রক্ষায় সৃষ্টিকর্তার কাছেও প্রার্থনা করেন।