হেফাজতে ইসলামের আমিরের আহ্বানে এক টেবিলে বসা সাত ইসলামী দল একসাথে পথ চলার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করলেও রাজনৈতিক ইস্যুতে তাদের এক হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইসলামী দলগুলোর নেতাদের একটি অংশের মতে, ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ থাকলেও নির্বাচন, জোট, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থান এতটাই ভিন্ন যে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে তাদের এক হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গত ১৬ জুলাই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে কওমি ঘরানার সাত ইসলামী দলের নেতাদের এক মতবিনিময় সভা চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদরাসায় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও ইসলামি ঐক্য জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। যাদের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সাথে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনেই পরাজয় বরণ করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত আন্দোলন বিরোধী জোট জামায়াতে ইসলামীর সাথে নির্বাচনী ঐক্য করে। এতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তিনটি ও খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়লাভ করে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে।
তারা পরস্পর বিপরীত জোটে থাকার পরও হেফাজতের বৈঠক শেষে এক প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সভায় উপস্থিত সাত দলের নেতারা আগামীতে ঐক্যবদ্ধভাবে পথ চলার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। বৈঠকে অংশ নেয়া হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রব্বানী নয়া দিগন্তকে বলেন, সাত ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তবে কোন পদ্ধতিতে সাত দল চলবে সে বিষয়ে মতামত জানাতে প্রত্যেক দলকে নিজেদের প্রস্তাব তুলে ধরতে আগামী ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। এ সময়ে দলগুলো তাদের মতামত হেফাজত আমিরের কাছে পেশ করবেন। এরপর আবার বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ নয়া দিগন্তকে বলেন, গত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র কওমি ঘরনার ইসলামী দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য দেখা দিয়েছে। পরষ্পর কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। এ অবস্থায় হেফাজত আমির একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে সাত ইসলামী দল ঐক্যবদ্ধভাবে চলার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছি। তবে এর ধরন কী হবে তা পরবর্তীতে ঠিক হবে। তিনি আরো বলেন, এখানে সাত দলের কোনো জোট হয়নি। ধর্মীয় বিভিন্ন ইস্যুতে কিভাবে আমরা আবার একমঞ্চে বসতে পারি সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর রাজনৈতিক বিষয় প্রত্যেক দল তাদের নিজেদের মতো ঠিক করবে।
বৈঠকে অংশ নেয়া খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের দলীয়ভাবে আগামী ২৫ জুলাই বৈঠক রয়েছে। সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হবে। তারপর সিদ্ধান্ত হবে আমরা কোন ধরনের মতামত হেফাজত আমিরের কাছে পেশ করব। তিনি বলেন, সাত ইসলামী দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আলোচনা কেবল শুরু হয়েছে। এখনো ঐক্য হয়ে যায়নি। এটা সময়ের ব্যাপার। সাত দল মতামত দেয়ার পর তখন বোঝা যাবে কতটা ঐক্য হবে। তবে খেলাফত মজলিস ১১ দলের সাথে থাকবে কি থাকবে না তা হেফাজতের বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত হবে না। আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সেখানে সিদ্ধান্ত হবে। তবে জাতীয় স্বার্থে ১১ দলের ঐক্য এখনো প্রাসঙ্গিক রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী নয়া দিগন্তকে বলেন, হেফাজতের বৈঠকে ইসলামী দলগুলোর দূরত্ব কমানো এবং সামনে কিভাবে একসাথে কাজ করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামীতে এটি জোট হবে কি না- তা এখনো পরিষ্কার নয়। দলগুলোর মতামত জমা দেয়ার পর আলোচনা হলে তখন একটা সিদ্ধান্ত হবে কোন ফরমেটে সাতটি ইসলামী দল চলবে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার নয়া দিগন্তকে বলেন, ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। আমাদের ঐক্য দরকার। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, ৪৭ এর আদর্শ ফিরিয়ে আনা, ফ্যাসিবাদের বিলোপসহ রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কার প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্যের গুরুত্ব এখনো প্রাসঙ্গিক রয়েছে।
ইসলামী অঙ্গনের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হেফাজতে ইসলাম নিজেকে দীর্ঘ দিন ধরে অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় কিংবা নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে সংগঠনটির সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, ধর্মীয় দাবি-দাওয়া আদায়ে হেফাজতের উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য হলেও রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করলে তা বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, বিরোধী জোটের চলমান ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে কয়েকটি ইসলামী দলকে আলাদা করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে এ নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে।
একাধিক ইসলামী দলের নেতারা বলছেন, বর্তমানে ইসলামী রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আদর্শগত নয়; বরং কৌশলগত। নির্বাচন, জোট গঠন, রাষ্ট্র সংস্কার, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের চেষ্টা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
তাদের মতে, ধর্মীয় ইস্যুতে যৌথ বিবৃতি দেয়া বা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন তুলনামূলক সহজ হলেও নির্বাচনী রাজনীতিতে আসন বণ্টন, নেতৃত্ব নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন।
ইসলামী রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরেই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে। ফলে কোনো একটি সংগঠনের নেতৃত্বে সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মে আনা সহজ নয়। বিশেষ করে অরাজনৈতিক পরিচয়ের একটি সংগঠন যদি রাজনৈতিক সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হেফাজতে ইসলামের বর্তমান উদ্যোগকে অনেকেই ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, একটি ধর্মভিত্তিক সামাজিক সংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সমন্বয়কারীর ভূমিকা নিতে চাইলে দলগুলোর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হতে পারে। ফলে উদ্যোগটি উল্টো রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ানোর কারণও হতে পারে।
অন্য দিকে হেফাজতের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, সংগঠনটির লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক জোট গঠন নয়; বরং ইসলাম, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়ানো। তাদের দাবি, ধর্মীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বিভক্ত অবস্থানের পরিবর্তে সমন্বিত অবস্থান তৈরি করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইস্যুকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন। ফলে হেফাজতের যেকোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যেকোনো ধরনের বৈঠক বা সমন্বয় রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ দিকে ইসলামী দলগুলোর কয়েকজন নেতা মনে করিয়ে দেন, অতীতে ইসলামী ঐক্যের নামে গঠিত বিভিন্ন জোট সময়ের সাথে কার্যকারিতা হারিয়েছে। অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অবস্থানের অমিলের কারণে সেসব উদ্যোগ স্থায়ী হয়নি। তাদের মতে, বর্তমান উদ্যোগও যদি একই পথে এগোয়, তাহলে তা ইসলামী রাজনীতিতে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশের অভিমত, হেফাজতে ইসলাম যদি তার ঘোষিত অরাজনৈতিক চরিত্র বজায় রেখে শুধুমাত্র ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা অক্ষুণœ থাকতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণে সরাসরি ভূমিকা নেয়ার চেষ্টা করলে অতীতে বিভিন্ন ইসলামী জোট যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছিল, তেমনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।



