পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ভ্রান্ত্র নীতির খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের জনগণকে। দলীয় লোকদের টাকা বানানোর জন্য একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়ে হয় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়লেও জ্বালানির ঘাটতিতে সেই সক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে ভর্তুকির বোঝা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরপরই এসেছে রমজান ও গ্রীষ্ম। এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। এই বাস্তবতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সরকারের জন্য বড় ধরনের নীতিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রমজানে সাহরি ও ইফতারের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে নতুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি গতকাল বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে প্রথম দিনের অফিসে এসে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রমজানে বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন রাখাই বর্তমানে প্রধান লক্ষ্য। নতুন বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘এখন প্রথম লক্ষ্য রোজা ও সেচ, এই দু’টি ম্যানেজ করে তারপর অন্য পরিকল্পনা। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ।’ তিনি বলেন, ‘এমন একটা খাতে আর এমন একটা সময়ে আসছি; কাল থেকেই রোজা শুরু হবে। বিদ্যুৎ ছাড়া কিছুই হয় না। রোজায় যত কম সম্ভব লোডশেডিং দেবো, কারিগরি কারণে যেটা হয় সেটি আলাদা বিষয়।’
গতকাল সচিবালয়ে নিজ দফতরের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি সবার সহায়তা চান। এ সময় ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এ মন্ত্রণালয়ে আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে জানিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমাদের কাছে বাংলাদেশ ফার্স্ট। আমরা চাই না, মন্ত্রণালয় দলীয় লোক দিয়ে পরিচালিত হোক। প্রশাসনের কাজ হবে দেশের কাজ করা, এর বাইরে অন্য কোনো কাজ নেই। আমরা চাই এমন একটা প্রশাসন থাকুক, যার কাজ থাকবে শুধু বাংলাদেশ নিয়ে।
মতবিনিময় শেষে বিদ্যুৎমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ। বকেয়া পরিশোধ করা না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা নিয়ে ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপপাএ) শঙ্কাসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বিপপা যদি এ কথা বলে থাকে তাহলে নতুন সরকারকে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শামিল হবে। বকেয়া পরিশোধ নিয়ে তাড়াহুড়া না করে সরকারকে সময় দিতে হবে।
গ্যাস উৎপাদন কমে বড় সঙ্কট : দেশে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৮০ কোটি ঘনফুটে। কয়েক বছর আগেও যা ছিল ২৭০-২৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়া এবং নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় সরবরাহে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের মোট চাহিদা এখন ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুটের মতো; অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট। এ ঘাটতি পূরণে উচ্চ দামে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। কিন্তু ডলার সঙ্কট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের কারণে প্রয়োজনীয় এলএনজি আমদানি করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে।
সক্ষমতা বাড়লেও উৎপাদন কম : বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার মেগাওয়াটেরও কম; অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকছে। এর প্রধান কারণ হলো গ্যাসের অভাব, এলএনজি আমদানির সীমাবদ্ধতা, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের জ্বালানি সঙ্কট ও ডলার সঙ্কটে জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়া। এ পরিস্থিতিতে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখা ছাড়া উপায় নেই।
ক্যাপাসিটি চার্জে ভর্তুকির চাপ : বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। ফলে উৎপাদন না করেও বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক সক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকারকে দিতে হচ্ছে। এতে বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
চাহিদা বাড়বে তীব্রভাবে : গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬-১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। রমজানে সাহরি ও ইফতারের সময় চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্দেশ দিলেও পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, এলএনজি আমদানি অনিশ্চিত ও কয়লা সরবরাহ সীমিত। এই বাস্তবতায় লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন মন্ত্রীর সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ : নতুন জ্বালানি মন্ত্রীর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে, রমজান ও গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, এলএনজি আমদানি বাড়ানো ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখা। আর মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, সমুদ্র এলাকায় ব্লক উন্মুক্ত করা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।
আর দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে, জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনা, আমদানিনির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাস ও নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব চাহিদানুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিকল্পনা করতে হবে, ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ কমাতে হবে, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে স্ব^ল্প সময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। বড় গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ সীমিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্রাধিকার দেয়া, ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হবে ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা : সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জনজীবনের সাথে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু জ্বালানি সঙ্কট সমাধান ছাড়া তা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সঙ্কট মূলত জ্বালানি সঙ্কটের প্রতিফলন। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও জ্বালানি নিশ্চিত না করে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে বাড়ছে ভর্তুকি, চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে। নতুন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, স্বল্পমেয়াদে রমজান ও গ্রীষ্ম সামাল দেয়া, মধ্যমেয়াদে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা। এই তিন স্তরের সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া বিদ্যুৎ খাতের সঙ্কট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।



