সোহেল মিয়া দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এখন মাদক চোরাচালানের অন্যতম নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, ডেন্ডি, ভারতীয় গাঁজা, দেশী-বিদেশী মদসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রতিদিনই এই সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে অবাধে। বিজিবি ও পুলিশের অভিযানেও থামছে না এই মাদকপ্রবাহ। এতে উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় জনগণ।
দোয়ারাবাজার থানা পুলিশের তথ্যমতে, গত ৪ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে সুরমা ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে ১৪২ পিস ইয়াবা ও ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ তিনজনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। এর আগেও গত ৩০ অক্টোবর শান্তিপুর এলাকা থেকে ৩০৫ পিস ইয়াবাসহ এক নারী কারবারিকে ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত ২ নভেম্বর টিলাগাঁও এলাকায় ৬৩ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ করা হয়, যদিও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধলাখ টাকার মাদক ও চোরাই পণ্য জব্দের তথ্য দিয়েছে সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির বাংলাবাজার বিওপি ক্যাম্প। তবে উপজেলার অন্যান্য সীমান্তে এমন অভিযান তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু এলাকায় প্রশাসনের অভিযান গোপনে ফাঁস হয়ে যায়, ফলে মূল কারবারিরা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যায়।
জানা গেছে, নরসিংপুর, বাংলাবাজার, বোগলাবাজার, লক্ষ্মীপুর ও সুরমা ইউনিয়নের একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট এখন মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট। বিশেষ করে শ্যামারগাঁও, শ্রীপুর, দ্বীনেরটুক, চাইরগাঁও, কলাউড়া-শিমুলতলা, ডালিয়া, বাঁশতলা, পেকপাড়া ও মহব্বতপুর এলাকা দিয়ে মাদক আসছে অবাধে। এসব মাদক পরে ছড়িয়ে পড়ছে সিলেট, ঢাকা ও অন্যান্য জেলায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে সিএনজি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক এমনকি প্রাইভেট কারও। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই নেই বৈধ কাগজপত্র। প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি এই ব্যবসার সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিজিবি ও পুলিশের যৌথ অভিযানে প্রায়ই মাদক ও মাদক বহনকারী যান জব্দ হচ্ছে, কিন্তু বড় কারবারিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাঝে মধ্যে অভিযানের পর সাময়িকভাবে চোরাকারবার বন্ধ থাকলেও অল্প কিছু দিন পর আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি। সুনামগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (২৮ বিজিবি) সম্প্রতি বাঁশতলা সীমান্তের হকনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে সীমান্ত হত্যা ও অনুপ্রবেশ রোধে জনসচেতনতামূলক সভার আয়োজন করে। সভায় অংশ নেন ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির, দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরুপ রতন সিংহ ও থানার ওসি জাহিদুল হক। বক্তারা সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জনগণের সহযোগিতা কামনা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, মাদকবিরোধী অবস্থান নিলে তারা হুমকি ও হয়রানির শিকার হন। কেউ কেউ সাজানো মামলাতেও জড়ানো হয়েছে। ফলে অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে চুপ করে থাকেন। ইউপি সদস্য আল আমিন বলেন, আমি মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম, এর পর থেকে বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং আমার নামে মামলা দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পুলিশ বা বিজিবির অভিযান দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার কঠোর নজরদারি, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সীমান্তে এই মাদক প্রবাহ বন্ধ না হলে তা পুরো দেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসবে।
দোয়ারাবাজার থানার ওসি জাহিদুল হক বলেন, মাদক ও চোরাচালান দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। জনগণের সহযোগিতা পেলে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল নাজমুল হক বলেন, প্রতিটি সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আমাদের কোনো দুর্বলতা নেই। তবে মাদক নির্মূলে জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
দোয়ারাবাজার সীমান্তে মাদকের এমন অবাধ প্রবাহ কেবল একটি উপজেলার সমস্যা নয়- এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সীমান্ত পারের এই ‘নিরাপদ রুট’ হয়ে উঠবে দেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়।



