নির্বাচনের বছর ভারতের সাথে সম্পর্ক চ্যালেঞ্জিংয়ের শঙ্কা

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • শেখ হাসিনাকে রেখেই রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিকল্পনা

  • প্রতিশ্রুতি দিয়েও থামেনি সীমান্ত হত্যা

  • এনআরসি দোহাই দিয়ে লাগাতার পুশইন

  • তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি প্রায় অনিশ্চিত

  • বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি : ব্রি. জে. রোকন উদ্দিন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর তাকে ভারতে আশ্রয় দেয়া, সংখ্যালঘু সুরক্ষা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ এবং সীমান্তে উত্তেজনার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশেই একে অপরের হাইকমিশনারকে তলব করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়াও সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সুযোগ সন্ধানী হিসেবে ভারত বাংলাদেশের সাথে অস্থিরতা তৈরি করার আশঙ্কা রয়েছে।

এসব কারণে প্রশ্ন ও শঙ্কা প্রকাশ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সম্পর্ক কিছুটা অবনতি বিদ্যমান রয়েছে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে দল সরকার গঠন করবে সেই দলের সাথে বা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেকটা চ্যালেঞ্জিং হবে।

নির্বাচন কি নতুন সঙ্কট আনবে? : একাধিক বিশ্লেকদের মতে চলমান নির্বাচনী প্রচারণার সময় রাজনৈতিক দলগুলোর ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান বা বক্তব্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে উত্তাপ ছড়াতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) মতো বিশ্লেষক সংস্থাগুলো মনে করছে, নির্বাচনে জয়ী হতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভারতবিরোধী আবেগ ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে নির্বাচিত সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি অত্যন্ত জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং বিষয়। বাস্তবতার নিরিখে এই ব্যালেন্সের বিশ্লেষণ করা হলে তাদের দেখা গেছে কূটনৈতিক টানাপড়েন ও বৈরিতার মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের শীতলতা বা ‘বৈরিতা’ তৈরি হয়েছে। ভারতের দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠ সরকারের আকস্মিক পতন এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের গুঞ্জন ভারতের পক্ষ থেকে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হলেও অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নির্ভরশীলতা কমানোর প্রচেষ্টা : আওয়ামী লীগ সরকারের ‘অতিরিক্ত ভারতনির্ভর’ নীতি থেকে সরে এসে অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। অর্থনৈতিক স্বার্থে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পাকিস্তান ও চীনের সাথে সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে

চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও সংযত নীতি : ভারতের সাথে করা বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ইতোমধ্যে একটি চুক্তি বাতিল করা হয়েছে এবং আদানি গ্রুপের সাথে জ্বালানি চুক্তিসহ আরো কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনার অধীনে রয়েছে। সরকার স্পষ্ট করেছে যে তারা ভারতের সাথে তিক্ততা চায় না, বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

এনআরসি দোহাই দিয়ে পুশইন : শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের পন্থা অবলম্বন করে আসছে। তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুশইন।

বিজিবি সদর দফতর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই হাজার ৩৪৪ জনকে জোরপূর্বক পুশইন করেছে ভারত। তার মধ্যে গত বছরের মে মাস এক হাজার ১৩৬ জন, জুন মাসে ৫৫৩ জন, জুলাই মাসে ৩২৭ জন, আগস্ট মাসে ১৩২ জন, সেপ্টেম্বরে ৮৩ জন, অক্টোবরে ২৫ জন, নভেম্বরে একজন, ডিসেম্বরে ৮৫ জন এবং চলতি মাসের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দুইজনকে পুশইন করা হয়। বিশ্লেষকদের দাবি, রাজনৈতিক সরকার গঠন হলে পুশইনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। কারণ ভারতের দায় বাংলাদেশের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। পুশইন হলে বাংলাদেশও একই ব্যবস্থা করবে। কারণ অনেক ভারতীয়রাও রয়েছে বাংলাদেশে। এতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি আরো বাড়বে।

সীমান্ত হত্যা: ২০১১ সালে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয় ফেলানীকে। ওই সময় ভারত দেশী-বিদেশীসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপে পরলেও ফেলানী হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ সম্পন্ন হয়নি গত দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও। তার পরও সীমান্ত হত্যা কমেনি। ভারতর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর গত বছরের ডিসেম্বও মাস পর্যন্ত এক হাজার ১৪৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার সবগুলোই বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘটেছে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব:) গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ভালো প্রতিবেশী হতে হলে ভারতের বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হবে। এটি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং পারস্পরিক মর্যাদা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশকে অনেক সময় ‘ছোট প্রতিবেশী’ বা ‘প্রভাববলয়ের অংশ’ হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এই আধিপত্যবাদী মানসিকতাকে অনেকেই ‘বিগ ব্রাদার সিনড্রোম’ বলেন। সেটি ত্যাগ না করলে প্রকৃত প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে অবশ্যই সমমর্যাদার সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করতে হবে, কথায় নয়, আচরণে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করাও অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচন, সরকার গঠন কিংবা রাজনৈতিক শক্তির উত্থান-পতন সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের নিজস্ব বিষয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি তৈরি হবে না। প্রকৃত বন্ধুত্ব অ-হস্তক্ষেপ নীতির ওপর দাঁড়ায়- এটাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক শিক্ষা।

সীমান্তে হত্যকিাণ্ডের বিষয়ে রোকন উদ্দিন বলেন, সীমান্তে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করাও একটি বড় পরীক্ষা। সীমান্ত হত্যা কোনোভাবেই ‘রুটিন ঘটনা’ হতে পারে না। নিরস্ত্র নাগরিকের প্রাণহানি বন্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা জরুরি। একজন প্রতিবেশীর নিরাপত্তা বাহিনী আরেক প্রতিবেশীর মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম হতে পারে না- এটি বন্ধুত্বের পরিপন্থী।

তিস্তা চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, অভিন্ন নদীর পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্নেও ন্যায্যতা অপরিহার্য। তিস্তা, ফেনীসহ সব অভিন্ন নদীতে একতরফা নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবেশীসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে। পানি কোনো দয়া নয়; এটি ন্যায্য অধিকার। স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তিই হতে পারে টেকসই সমাধান।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিও বদলাতে হবে দাবি করে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রোকন উদ্দিন বলেন, ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। রাষ্ট্র ও জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্কই সুস্থ কূটনীতির একমাত্র পথ। তা না হলে সরকার বদলালেই সম্পর্কের ভরকেন্দ্র নড়ে যাবে, তা দুই দেশের জন্যই ক্ষতিকর। তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্কেও সমতার নীতি জরুরি। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং বাংলাদেশকে কেবল একটি বাজার হিসেবে নয়, একজন প্রকৃত অংশীদার হিসেবে দেখা দরকার। এতে সহযোগিতা বাড়বে, আস্থাও গভীর হবে। বাংলাদেশ শত্রুতা চায় না; কিন্তু অবজ্ঞা ও আধিপত্যও মেনে নেয় না। শক্তির ভাষা নয়, সম্মানের ভাষায় কথা বললেই কেবল একটি ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাশীল ও স্থিতিশীল প্রতিবেশী সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্যও অপরিহার্য।

রোকন উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তীকালীন সরকারের গঠন এবং ২০২৫ সালে ১৫ই নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে ঐতিহাসিক রায় এই সব ঘটনা প্রবাহ কেবল বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত নয় বরং ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ভারতের ভূমিকা অবস্থান ও নীতিগত সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককেই প্রভাবিত করবে না বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নৈতিকতা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু আরেকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, এটি ভারতের সাথে দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত ভাগ করে গভীর ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সংযোগ বহন করে এবং নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ফলে বাংলাদেশের যে রকম ভারতের দরকার আছে ভারতেরও বাংলাদেশের দরকার আছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রিক বৈধতা ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থানের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত।

স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সুবিধার জন্য দীর্ঘমেয়াদি আস্থা বিসর্জন দেয়া বৈশ্বিক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে ভারতের প্রতিবেশী নীতির তার নৈতিক অবস্থান ও বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। ভবিষ্যতের প্রতিবেশী নীতি ভারতের বাংলাদেশ নীতি একটি পরিণত টেকশই ভিত্তির উপর দাঁড় করানো উচিত। প্রথমত, সার্বভৌমত্বের প্রতি নিঃশর্ত সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত যেকোনো ধরনের শর্তমুক্ত থাকতে হবে শর্তযুক্ত করা যাবে না এবং এতে কোনো হস্তক্ষেপ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা জোরদার করা জরুরি যাতে সম্পর্ক ব্যক্তি বা দলনির্ভর না হয়ে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকে। তৃতীয়ত, আইনানুগ বিচারিক সহযোগিতার মাধ্যমে পলাতক অপরাধী অভিযুক্তদের বিষয়ে দ্বৈত মানদণ্ড পরিহার করে দ্বিচারিতা পরিহার করে আইনের শাসনকে সমর্থন করতে হবে এবং যা চুক্তি আছে ওই চুক্তিকে সম্মান করে তা পালন করতে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। চতুর্থত, অহেতুক হস্তক্ষেপ নীতি কার্যকরভাবে বাতিল করে ভারতের ভূখণ্ড কোনোভাবেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা অস্থিতিশীল কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হতে দেয়া যাবে না। পঞ্চমত, জনসম্পৃক্ত আস্থা পুনর্গঠন, অপরিহার্য শিক্ষা সংস্কৃতি ও সমাজভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করাই দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। এই পাঁচটি নীতি বাস্তবায়ন করা কোনো তাৎক্ষণিক কূটনীতিক কৌশল নয় বরং এটি ভারতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। এই পথেই ভারত একটি দায়িত্বশীল প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক স্থীতিশীলতার নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা : বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলো চায় ভারত যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে এবং একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখে এই জনআকাক্সক্ষা পূরণ করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে নির্বাচিত সরকারের আমলে ভারতের সাথে সম্পর্কের পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সরকার এক দিকে ভারতের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে অন্য দিকে অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে দীর্ঘদিনের একপক্ষীয় নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে একটি নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চালাতে পারবে। একটি নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে ‘রিসেট বাটন’ টেপার সুযোগ তৈরি হবে। ভারতও বর্তমানে বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক শক্তির সাথে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী, বিশেষ করে বিএনপির সাথে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ : নির্বাচন পরবর্তী সরকারের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি করা হতে পারে, যা ভারতের জন্য একটি কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার বিষয় হবে। তবে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশের একটি নির্বাচিত সরকারের সাথেই দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল সম্পর্কে যেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। নির্বাচন বছরটি যেমন উত্তেজনার ঝুঁকি রাখে, তেমনি এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তিক্ততা কাটিয়ে একটি নতুন স্বাভাবিকতা বা ‘স্ট্যাবিলিটি’ আনার সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।