চীনের প্রেসিডেন্ট, বিনিয়োগকারীসহ নানা পক্ষের সাথে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক

৯ চুক্তি ও সমঝোতায় স্বাক্ষর ২.১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি

নদী ব্যবস্থাপনায় ৫০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

আশরাফুল ইসলাম ও কাওসার আজম, বেইজিং (চীন) থেকে
Printed Edition
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেইজিংয়ের পিপলস গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করেন
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেইজিংয়ের পিপলস গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করেন |পিআইডি

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চার দিনের চীন সফরকে ঐতিহাসিক হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার এ সফরের সময় চীন সরকার ও কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ, ঋণ এবং অনুদান হিসাবে ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তিনি বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকার আহ্বান জানান। এ ছাড়া বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করতে চীনের কাছে ৫০ বছরের মাস্টারপ্লান চান ড. ইউনূস। এ দিকে প্রধান উপদেষ্টার এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

গতকাল প্রধান উপদেষ্টা বেইজিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। তার এই সফর নিয়ে ঢাকা ও বেইজিং যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, তিস্তা নদী প্রকল্প এবং মংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে একসাথে কাজ করতে সম্মত হয় দুই দেশ।

এশিয়ার বোয়াও ফোরামের সেক্রেটারি-জেনারেলের আমন্ত্রণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস গত বুধ ও বৃহস্পতিবার চীনের হাইনান প্রদেশে বিএফএ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। পরে চীন সরকারের আমন্ত্রণে বৃহস্পতিবার রাতে বেইজিং আসেন। আজ শনিবার তিনি দেশে ফিরবেন।

এর আগে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডিং শুয়েশিয়াং হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরামের সাইডলাইনে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং-ও বেইজিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন। উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে গভীর আলোচনা করে এবং বিস্তৃত সম্মতিতে পৌঁছায়। প্রধান উপদেষ্টা বোয়াও ফোরামের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।

চীন সরকার অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বাগত জানায় এবং আগস্ট ২০২৪ থেকে সরকারের নেয়া সংস্কার ও অগ্রগতির প্রশংসা করে। বাংলাদেশ চীন সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষ সমগ্র কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব পুনরায় নিশ্চিত করে।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশ একমত হয়েছে যে, চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিবর্তনের মধ্যেও এই সম্পর্ক সুসংহত ও স্থিতিশীলভাবে বিকশিত হয়েছে। উভয় পক্ষ পাঁচটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি মেনে চলার, পারস্পরিক আস্থা আরো গভীর করার এবং উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় জোরদার করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও প্রধান স্বার্থে পারস্পরিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বিবৃতিতে বলা হয়, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি মেনে চলে। চীন বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতায় সমর্থন জানায়। একইভাবে বাংলাদেশ ‘এক চীন নীতির’ প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

উভয় পক্ষ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের অধীনে উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয় জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ মংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নে একসাথে কাজ করতে চায়।

যৌথ বিবৃতিতে আরো বলা হয়, চীন-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা দ্রুত শুরুর এবং বাংলাদেশী পণ্য চীনে রফতানি বৃদ্ধি করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়। বাংলাদেশ চীনা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। উভয় দেশ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা প্রতিরোধ, নদী খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সম্মত হয়। বাংলাদেশ তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানায়।

বিবৃতিতে উভয় পক্ষ ২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি ও ‘বাংলাদেশ-চীন জনসংযোগ বর্ষ’ উদযাপনের বিষয়ে একমত হয়। বাংলাদেশ চীনের দেয়া স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার প্রশংসা করে, যা ইউনান প্রদেশে বাংলাদেশী রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ প্রদান করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ গঠনের চীনা দৃষ্টিভঙ্গি এবং ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে’র প্রশংসা করে। উভয় পক্ষ গ্লোবাল সাউথের ঐক্য ও স্বনির্ভরতা বাড়াতে একসাথে কাজ করবে। উভয় পক্ষ জাতিসঙ্ঘ সনদের মূলনীতি মেনে চলার এবং বহুপক্ষীয়তাকে সমর্থন করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় দেশ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করবে। বাংলাদেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত জনগণের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করে। চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ড. ইউনূসের সফরের সময় উভয় দেশ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, সংবাদ ও গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং চীনা জনগণের উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং চীনের নেতৃবৃন্দকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা : বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আন্দোলন একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার পথ তৈরি করেছে। চীনের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনুস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ও সামাজিক ব্যবসার প্রসারে চীনের সাথে তার বিশেষ সংযোগ রয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনুস ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজ নিজ দেশের পক্ষে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন। এই সফরে তার সাথে রয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি খলিলুর রহমান, এসডিজিবিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

প্রেস সচিব শফিকুল আলম এ বিষয়ে বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুসের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বলেছেন, তার সরকার বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে এবং চীনা উৎপাদন শিল্পকে স্থানান্তরকেও উৎসাহিত করবে। তিনি আরো বলেন, চীন বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব জানান, এই দুই নেতার মধ্যে চীনা ঋণের সুদহার কমানো এবং পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি অত্যন্ত সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তরিক এই আলোচনা ছিল বিস্তৃত, ফলপ্রসূ এবং গঠনমূলক। প্রেসিডেন্ট শি প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এটি অধ্যাপক ইউনূসের বিদেশে প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল এবং এখন পর্যন্ত এটি একটি বড় সাফল্য।’ ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উৎসাহিত করবে চীন। এ ছাড়া চীনা উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে স্থানান্তরকেও উৎসাহিত করবে। তিনি আরো বলেন, চীন বাংলাদেশ কর্তৃক উত্থাপিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে। এর মধ্যে চীনা ঋণের সুদহার কমানো এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রেস সচিব আরো বলেছেন, প্রেসিডেন্ট শি বাংলাদেশে তার দু’টি সফরের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ফুজিয়ান প্রদেশের গভর্নর থাকাকালীন তিনি মাইক্রোক্রেডিট অধ্যয়ন করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলার আম এবং কাঁঠালও খেয়েছেন, যা অত্যন্ত সুস্বাদু। বাংলাদেশ আগামী মাসগুলোতে এই দুটি ফল চীনে বড় পরিসরে রফতানি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

চীনে সফরের দ্বিতীয় দিনে ড. ইউনূস চীনা বাজারে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত এবং কোটা-মুক্ত প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি অর্জন করেন। তিনি চীনা উৎপাদন শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা করেন।

এ দিকে চীন কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) ভাইস-চেয়ারম্যান ইয়াও ওয়াং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

চীনের ২.১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি : বাংলাদেশী কর্মকর্তারা ও ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই বিনিয়োগ বাংলাদেশে চীনের জন্য নির্ধারিত শিল্পাঞ্চলে (Chinese Industrial Economic Zone) করা হবে। এ ছাড়া চীন মংলা বন্দরের আধুনিকায়নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ, চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করবে। অবশিষ্ট অর্থ অনুদান ও অন্যান্য ঋণের মাধ্যমে আসবে।

৫ আগস্ট পতনের প্রায় এক মাস আগে শেখ হাসিনা চীন সফর করেন। ওই সফরের সময় মাত্র ১৬ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি তৎকালীন আওয়ামী সরকার। ড. ইউনূসের এই সফরের সময় চীনের ২.১ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতিকে বড় সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এই সফর চীনা বিনিয়োগে ব্যাপক উত্থান ঘটাতে পারে। রাষ্ট্রপতি শি বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের জন্য চীনা কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান আশিক চৌধুরী। তিনি আরো বলেন, এই সফর চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে রাজি করাতে বড় ভূমিকা রাখবে। এখন এটি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

এ দিকে গতকাল শুক্রবার প্রফেসর ইউনূস ও আশিক চৌধুরী বেইজিংয়ে ১০০টিরও বেশি চীনা কোম্পানির কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। তারা উন্নত বস্ত্রশিল্প, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তারা তিনটি ইন্টারেক্টিভ সেশনে চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সম্ভাবনাগুলো উপস্থাপন করেন। এখন পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত ইতিবাচক বলে জানান আশিক চৌধুরী।

নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের কাছে ৫০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান

চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা : বাংলাদেশের নদী ও পানি ব্যবস্থাপনাকে সুসংহত করতে সহায়তা করবে- চীনের কাছে এমন ৫০ বছরের মাস্টারপ্লান চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বিকেলে বেইজিংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করেন চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গোয়েইং। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা চীনের কাছে এই আহ্বান জানান।

ড. ইউনূস চীনের উন্নত পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে বলেন, আপনারা বিশ্বের অন্যতম সেরা পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছেন। আমরা একই সমস্যার মুখোমুখি, তাই আপনাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে চাই। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ দেশ, যেখানে শত শত নদী ছড়িয়ে আছে। পানি আমাদের জীবন দেয়, তবে কখনো কখনো এটি শত্রু হয়ে ওঠে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পানির সাথে সম্পর্ক ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা চীনকে পানি ব্যবস্থাপনার মাস্টার হিসেবে অভিহিত করে বলেন, বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। তিনি রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের পানি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের সাথে ভাগ করে নেয়ার আহ্বান জানান।

তিনি উল্লেখ করেন, জনসংখ্যা ও উন্নয়নের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে নদীর পাড় দখল হয়ে যাচ্ছে। একই প্রবণতা ভারতেও দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া নদীর তলদেশে পলি জমে যাওয়ার ফলে অনেক নদী সংকুচিত বা মৃতপ্রায় হয়ে যাচ্ছে।

চীনা মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশ ও চীন একই ধরনের পানি ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তিনি বাংলাদেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ জনগণ বন্যাপ্রবণ এলাকায় বাস করে, যা পানি ব্যবস্থাপনাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের চীনের পানি ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহীত মাস্টারপ্ল্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এটি কাজে লাগিয়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি। বাংলাদেশকেও এমন একটি পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করতে চাই।

প্রধান উপদেষ্টা বিশেষভাবে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা এবং ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণমুক্তকরণে সহায়তা চেয়েছেন।

চীনা বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বৈঠক : চীনা বিয়োগকারীদের বাংলাদেশে ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আপনারা (চীনা বিনিয়োগকারীরা) বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনার সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরী পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। এ ছাড়া বাংলাদেশ এমন একটি চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বড় বড় নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের কথা উল্লেখ করে তিনি বাণিজ্য ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সমুদ্রের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। তিনি এসব দেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ওপর জোর দেন, যা বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের মানব সম্পদের সম্ভাবনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং প্রতি বছর আরো ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ড. ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ বাস করে। যাদের বেশির ভাগই যুবক। যারা উদ্যম, সৃজনশীলতা ও উচ্চাকাক্সক্ষায় পরিপূর্ণ। প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর অব্যবহৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর অভাব নেই- পুরুষ এবং নারীরা সমানভাবে অংশগ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের রূপান্তর প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি এক সম্পূর্ণ নতুন দেশে পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, দেশে নতুন প্রজন্ম উঠে আসছে, যা ব্যবসা ও বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বক্তৃতা করেন।

৯ চুক্তি ও সমঝোতায় স্বাক্ষর : বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার চার দিনের চীন সফরের শুক্রবার তৃতীয় দিনে দুই দেশের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়।

সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। এর পাশাপাশি, প্রধান উপদেষ্টার দ্বিপক্ষীয় চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে পাঁচ বিষয়ে সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে। এগুলো হলো- বিনিয়োগ আলোচনা শুরু করা, চীনের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ, একটি রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং একটি কার্ডিয়াক সার্জারি গাড়ি অনুদান।

এর আগে গত বুধবার বিকেলে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের হাইনান প্রদেশে পৌঁছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার বোয়াও ফোরামে বক্তব্য রাখেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। এ দিন রাতে তিনি বেইজিংয়ের পৌঁছেন।

প্রধান উপদেষ্টা একই স্থানে তিনটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন, যেগুলোর মূল বিষয়বস্তু- টেকসই অবকাঠামো ও জ্বালানি বিনিয়োগ, বাংলাদেশ ২.০: উৎপাদন ও বাজারের সুযোগ এবং সামাজিক ব্যবসা, যুব উদ্যোক্তা ও থ্রি জিরো বিশ্ব।

এই আলোচনায় তিনি বিভিন্ন কোম্পানির সিইও, সামাজিক ব্যবসা ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, বিখ্যাত চীনা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করেন। প্রধান উপদেষ্টা গতকাল চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আয়োজিত নৈশভোজেও অংশ নেন। আজ শনিবার সকালে তিনি পিকিং ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা করবেন। সেখানে তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হবে। চার দিনের চীন সফর শেষে আজ তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।