বন্যপ্রাণীর জন্য উড়াল সেতু

সব বনে চালু হোক

Printed Edition

মধুপুর জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে চলে গেছে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। সড়কে দ্রুতগতিতে চলাচল করে যানবাহন। বনের প্রাণীরা এই সড়ককেও মনে করে বনের অংশ। একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত করে খাবারের খোঁজে। এতে গাড়িচাপা পড়ে বেঘোরে মারা যায় বানর, হনুমান, গন্ধগোকুল ও বাঘডাশার মতো প্রাণী।

এসব প্রাণহানি বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। মধুপুর বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কের পাঁচটি পয়েন্টে প্রাণীর জন্য তৈরি করা হয়েছে উড়াল সেতু। উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এই কৃত্রিম পারাপার ব্যবস্থা কিছুটা হলেও তাদের বিচরণ নিরাপদ করবে। তবে বিশাল বনে মাত্র পাঁচটি উড়াল সেতু যথেষ্ট নয়।

একসময় প্রায় ৬২ হাজার একরজুড়ে ছিল মধুপুর বন। এখন অবৈধ দখল ও গাছ উজাড় হয়ে যাওয়ায় সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। দেখা দিয়েছে প্রাকৃতিক খাবারের সঙ্কট। অস্তিত্ব সঙ্কটে আছে বন্যপ্রাণীরা। খাবারের খোঁজে সড়কের পাশে এবং লোকালয়েও চলে আসছে তারা। অসচেতন পর্যটকরা অনেক সময় প্রাণীদের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দেয়। খাবার খেতে গিয়েও দুর্ঘটনায় পড়ে প্রাণীরা। সড়কে চালকরা বেপরোয়া গাড়ি চালান। গতিরোধ নির্দেশনা মানার প্রবণতা দেখা যায় না তাদের। এসব সমস্যার সমাধান না করলে কেবল কয়েকটি উড়াল সেতু বানিয়ে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ রাখা যাবে না। তারপরও বলা যায়, একটি ইতিবাচক উদ্যোগ শুরু হলো। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ আরো এগিয়ে নেয়া দরকার।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যপ্রাণী রক্ষায় আরো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই সুন্দরবন, লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন বনে বন্যপ্রাণীর জন্য বিশেষ অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান গড়ে তোলা হয়েছে। বন্যপ্রাণীর অবমুক্ত প্রজনন ও সংরক্ষণের জন্য গাজীপুর ও ডুলাহাজারায় আধুনিক সাফারি পার্ক করা হয়েছে। পাহাড়ে হাতি চলাচলের রাস্তা চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের ফসলের ক্ষতিপূরণ দেয়ার মতো ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। কেবল হাতির জন্য নয়, অন্য বন্যপ্রাণীর জন্যও এক বন থেকে অন্য বনে যাতায়াতের ‘সবুজ করিডোর’ রাখতে হবে। এ জন্য বেদখল হওয়া বনের জমি উদ্ধার করতে হবে। এসব জমিতে নতুন বনায়ন করতে হবে। শুধু গাছে বিচরণকারী প্রাণীর জন্যই নয়, মাটিতে চরে বেড়ানো স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপদের জন্য সড়কের নিচে পরিবেশবান্ধব আন্ডারপাস বা গ্রিন ওভারপাসও বানানো যেতে পারে।

পর্যটকরা যাতে বনের যেখানে-সেখানে বন্যপ্রাণীদের খাবার ছুড়ে না দেন, এর জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করতে হবে। বনের ভেতরে নির্দিষ্ট দূরত্বে প্রাকৃতিক ফলদ গাছ রোপণ করে ‘ফিডিং জোন’ বা বন্যপ্রাণীদের জন্য নিরাপদ চারণভূমি গড়ে তোলা জরুরি। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা ও রাডার বসিয়ে আইন অমান্যকারী চালকদের চড়া জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও গাড়িচালকদের মধ্যে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।

বন্যপ্রাণী আমাদের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের অংশ। মধুপুরের রোপওয়ে প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলোকে মডেল হিসেবে ধরে দেশের অন্যান্য বনাঞ্চলেও এর বাস্তবায়ন করতে হবে।