ক্রীড়া প্রতিবেদক
ডারউইনের উইকেটে বাংলাদেশের ইনিংসটা ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে ছিল একের পর এক হতাশা, ভুল আর ব্যর্থতার গল্প। দ্বিতীয় অংশে শুধু একজন, ওয়ান ম্যাচ শো-মেহেদী হাসান মিরাজ। দলের শীর্ষ সারির ব্যাটাররা যখন অস্ট্রেলিয়া একাদশের বোলিংয়ের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করছিলেন, তখন একাই প্রতিরোধ গড়ে তুললেন এই অলরাউন্ডার। তার দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে নিশ্চিত বিপর্যয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে ১ম ইনিংসে সব উইকেট হারিয়ে ২৬৩ রানের সংগ্রহ বাংলাদেশের! ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ দিনশেষে ২ উইকেটে ৫১ রান। যেখানে ১ রানেই হারায় ২ উইকেট। ক্যাম্পবেল কেলাওয়েকে (০) বোল্ড করেন তাসকিন। আর হাসান মাহমুদ নিয়েছেন স্যাম কনস্টাসের উইকেট। প্রথম দিনশেষে ২১২ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ।
প্রায় ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ১৩ আগস্ট শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত সিরিজের প্রথম টেস্ট। সেই লড়াইয়ের আগে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচকে নিজেদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের বড় মঞ্চ হিসেবে দেখছিল টাইগাররা। প্রথম দিনের শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না।
টসে জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে ব্যাটার, সেটা অনুমিতই ছিল। মূল সিরিজে মাঠ নামার আগে প্রস্তুতি ম্যাচেই দেখা গেল বাংলাদেশের ব্যাটারদের কঙ্কালসার চেহারা। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশে থাকা আনকোরা-অচেনা পেসারদের সামনেই মুখ থুবড়ে পড়ে সফরকারীরা। তানজিদ তামিম, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহীম, অমিত হাসান কিংবা সৌম্যরা ব্যাট হাতে নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছেন।
ইনিংসের অষ্টম বলেই প্রথম ধাক্কা। কোনো রান না করেই ফিরেন ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। শুরুতেই সেই আঘাত সামলে ওঠার আগেই আরো ধস ব্যাটিংয়ে। সাদমান ইসলাম কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে ৩১ রান করলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। মুমিনুল হক দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকেও থামেন মাত্র ১৬ রানে। অধিনায়ক শান্ত ৩৭ রান করে ভালো শুরুকে বড় করতে ব্যর্থ হন। অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহীমও রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফেরেন। অমিত হাসানের ব্যাট থেকেও আসে মাত্র ১৫ রান। একসময় স্কোরবোর্ডে ৬উইকেটে ১১০ রান।
এমন পরিস্থিতিতে ক্রিজে ছিলেন মিরাজ। টিম ম্যানেজমেন্টের প্রত্যাশা মেটাতে না পারায় সম্প্রতি ওয়ানডে অধিনাকত্ব হারিয়েছেন। পারফরম্যান্স করে দলে জায়গা টিকিয়ে রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল তার সামনে। এমন চাপের মুখে জ্বলে উঠলেন মিরাজ। অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত হলেও সে দিন তাকে খেলতে হয়েছে একজন বিশেষজ্ঞ ব্যাটারের মতো। শুরুতে ঝুঁকি না নিয়ে ইনিংস গড়েছেন, পরে সুযোগ বুঝে খেলেছেন আক্রমণাত্মক ক্রিকেট। সৌম্য সরকারের সাথে ছোট একটি জুটি গড়ে চাপ কিছুটা কমান। সৌম্যও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। এরপর শুরু হয় মিরাজের আরেক পরীক্ষা।
নিচের সারির ব্যাটারদের সাথে একের পর এক ছোট ছোট জুটি গড়ে ইনিংসকে টেনে নেন। তাইজুল ইসলাম, খালেদ আহমেদ ও হাসান মাহমুদ-প্রত্যেকেই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুক্ষণ উইকেটে থেকে মিরাজকে সঙ্গ দেন। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের ইনিংসকে নিয়ে যান অন্য উচ্চতায়। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের সাথে আক্রমণাত্মক মানসিকতার দুর্দান্ত সমন্বয় দেখা যায় তার ইনিংসে। মাত্র ১২৮ বলে পূর্ণ করেন শতক। শেষ পর্যন্ত ১৪১ বলে অপরাজিত ১০৯ রান করে মাঠ ছাড়েন তিনি। তার ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও চারটি ছক্কা। ইনিংসটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, দলের জন্যও ছিল বড় স্বস্তির।
একসময় যেখানে বাংলাদেশের দেড় শ’ রান করাও অনিশ্চিত মনে হচ্ছিল, সেখানে মিরাজের ব্যাটে ভর করে স্কোরবোর্ডে যোগ হয় ২৬৩ রান। সংখ্যাটা হয়তো খুব বড় নয়, কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি ছিল সংগ্রাম করে অর্জন করা একটি সম্মানজনক সংগ্রহ।
বাংলাদেশের ব্যাটিং ব্যর্থতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল অস্ট্রেলিয়া একাদশের স্পিনার কোরি রকিচোলির। ২৪ ওভারে ৮৩ রান দিয়ে একাই তুলে নেন ৬ উইকেট। তার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে বাংলাদেশের টপ অর্ডার কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে। এ ছাড়া হ্যানো জ্যাকবস, ক্যাম্পবেল থম্পসন ও জেভিয়ার ক্রোন একটি করে উইকেট নেন।
এই ইনিংস হয়তো বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলবে। অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের ব্যর্থতা টিম ম্যানেজমেন্টের দুশ্চিন্তা বাড়াবে। তবে একই সঙ্গে মিরাজের শতক কঠিন সফরের আগে আশার আলোও দেখিয়েছে। যখন চার দিকে ব্যর্থতার মিছিল, তখন একজন ক্রিকেটার দেখিয়ে দিলেন ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর আত্মবিশ্বাস থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও লড়াই করা যায়। ডারউইনের প্রথম দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই ২৬৩ রান নয়, মেহেদী হাসান মিরাজের সেই ইনিংস! যে ইনিংস মনে করিয়ে দিলো বিপর্যয়ের মধ্যেও একজন ক্রিকেটার কখনো কখনো পুরো দলের সাহস হয়ে উঠতে পারেন।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাঠে টেস্ট সিরিজ খেলছে বাংলাদেশ। বর্তমান সিরিজের দলে থাকা মুশফিক, শান্ত কারোরই ২০০৩ সালে বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেক হয়নি। সেবার খালেদ মাহমুদ সুজনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দু’টি ম্যাচই ইনিংসে হেরেছিল। যার মধ্যে ডারউইনেই একটি টেস্ট শেষ হয়েছিল তিন দিনেই। সেই ডারউইনে এবার তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচের শুরুটা ভালো করেছে বাংলাদেশ। সংক্ষিপ্ত স্কোর :
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস : ৭৫.৫ ওভারে ২৬৩ (সাদমান ৩১, তানজিদ ০, মুমিনুল ১৬, শান্ত ৩৭, মুশফিক ০, অমিত ১৫, মিরাজ ১০৯*, সৌম্য ১৬, তাইজুল ১০, হাসান ৪, খালেদ ১৫, জ্যাকবস ১/২৮, থমসন ১/২৬, ক্রোন ১/৪৮, রকিচ্চলি ৬/৮৩, মেনজিস ০/৪৫, ওয়াদিয়া ১/২৬)।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ ১ম ইনিংস : ১২ ওভারে ৫১/২ (কনস্টাস ১, কেলাওয়ে ০, প্যাটারসন ২৬*, ফিলিপি ২২*; তাসকিন ১/২৪, হাসান ১/৪)।



