জরুরি প্রয়োজনে একীভূত পাঁচ ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা তোলা যাবে

প্রশাসক নিয়োগ বিধিমালা ও সংশোধিত রেজুলেশন স্কিম অনুমোদন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সমস্যাকবলিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল করতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় রেজুলেশনের আওতায় নেয়া হবে- এমন যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) প্রশাসক নিয়োগের বিধিমালা অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সাথে রেজুলেশনের আওতায় থাকা একীভূত পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরতের জন্য ঘোষিত স্কিমে সংশোধনীও অনুমোদন করা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

এর ফলে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের আর কোনো বাধা থাকবে না। সে অনুযায়ী প্রথমে তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যথা প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ফ্যাস (এফএএস) ফাইন্যান্স, আভিবা ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। প্রশাসক বসানো হবে চলতি মাসেই অথবা আগামী ২ আগস্ট।

এ দিকে সংশোধিত স্কিম অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকরা এখন থেকে শুধু নিজের চিকিৎসার জন্য নয়, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসহ অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। আগে কেবল আমানতকারীর নিজের চিকিৎসার প্রয়োজনেই এই অর্থ তোলার অনুমতি ছিল। রেজুলেশনের আওতায় থাকা পাঁচ ব্যাংক হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এসব ব্যাংক একীভূত করে বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমানতকারীদের অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেয়ার লক্ষ্যে আগে ঘোষিত স্কিমে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই প্রস্তাবই পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন স্কিমে চিকিৎসার পাশাপাশি অন্যান্য মানবিক ও জরুরি প্রয়োজনে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও ভাই-বোনের চিকিৎসার ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, বাস্তবে অনেক গ্রাহক এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে চিকিৎসা ছাড়াও জরুরি প্রয়োজনে অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। কারো মেয়ের বিয়ে, কারো উচ্চশিক্ষার ব্যয়, আবার কারো পরিবারের সদস্যের জরুরি চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য অর্থ প্রয়োজন হলেও আগের নীতিমালায় তা অনুমোদিত ছিল না। ফলে অনেক আবেদন বিবেচনা করা সম্ভব হয়নি। সংশোধিত স্কিমে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করায় গ্রাহকদের দুর্ভোগ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

একই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক রেজুলেশনের আওতায় নেয়া হবে এমন যেকোনো ব্যাংক বা নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের জন্য পৃথক বিধিমালাও অনুমোদন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন বিধিমালার ফলে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মারাত্মক আর্থিক সঙ্কটে পড়লে দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ করে কার্যক্রম পরিচালনা, সম্পদ সংরক্ষণ এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। এটি ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামো বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য দিকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে। ওই সময়ে জামানত ছাড়াই ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ ঋণ আকারে টাকা বের করে নেয়া হয়। দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে এবং তারা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার মূলধন হিসেবে দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বড় আমানতকারীদের শেয়ার দেয়া হবে।

এ ছাড়া আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আট লাখ ২২ হাজার আমানতকারীকে মোট তিন হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তিন লাখ ৫০ হাজার গ্রাহককে প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে পাঁচ ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে জামানতের পরিমাণ মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ ঋণই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছিল। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এত উচ্চ খেলাপি ঋণের হার দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে অন্যতম বড় সঙ্কট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রশাসক নিয়োগের নতুন বিধিমালা এবং সংশোধিত রেজুলেশন স্কিম বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যাকবলিত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম আরো কার্যকর হবে। একই সাথে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া সহজ ও মানবিক হবে এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে এসব সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।