দুর্নীতি, অনিয়ম আর চরম অব্যবস্থাপনায় ডুবছে পরিবেশ অধিদফতর। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিয়ম লঙ্ঘন করে ঢালাওভাবে দেয়া হচ্ছে পরিবেশগত ছাড়পত্র। তদারকির অভাব, প্রকল্পে শর্ত লঙ্ঘন এবং প্রভাবশালীদের চাপে প্রতিষ্ঠানটি এখন জনস্বার্থ রক্ষায় কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনবল সঙ্কটের অজুহাত দিয়ে অধিদফতরের কর্মকর্তারা সরেজমিনে না গিয়েই অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ ছাড়পত্র দিচ্ছেন। এমনকি যেসব শিল্প কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি নেই, তারাও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ছাড়পত্র ও নবায়ন পেয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি সনদের জন্য কর্মকর্তাদের এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয় বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। উৎকোচ নিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড জেনেও তারা নিশ্চুপ থাকছেন। ইটভাটার লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম মানা হচ্ছে না। প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মকর্তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণেই দেশের নদ-নদী ও খালগুলো ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে এবং পরিবেশের ভয়াবহ অবনতি ঘটছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদফতরকে একটি ‘দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। টিআইবি জানায়, আমলা-নির্ভরতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির কারণে এখানে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়েছে।
সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৭ শতাংশ শিল্প কারখানা কোনো প্রকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়াই ছাড়পত্র পেয়েছে। আবাসিক এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে তা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া, ছাড়পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে শ্রেণীভেদে সর্বনিম্ন ৩৬ হাজার থেকে এক লাখ আট হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ম-বহির্ভূত আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকে।
অনিয়মের বিষয়ে অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে জানান, জনবল সঙ্কটের কারণে সব জায়গায় নিয়মিত তদারকি সম্ভব হয় না। অনেক সময় মেগা প্রকল্প বা প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক চাপে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত না নিয়ে ‘নিরুপায়’ হয়ে ছাড়পত্র দিতে হয়। তবে আর্থিক সুবিধা নেয়ার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবেশ অধিদফতরের এই প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা রোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।



