হাবিবুল বাশার
প্রচণ্ড গরমে শুধু জনজীবনই বিপর্যস্ত হচ্ছে না, সরাসরি আঘাত পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের আয়ে। তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে শ্রমিকরা বছরে অন্তত ৭৭ হাজার কোটি টাকা মজুরি হারাচ্ছেন, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। অর্থাৎ তীব্র তাপপ্রবাহ এখন শুধু স্বাস্থ্যগত বা পরিবেশগত সঙ্কট নয়, এটি ক্রমেই বড় অর্থনৈতিক তির কারণ হয়ে উঠছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) এবং অলাভজনক সংস্থা ওকেইউপি-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকার ১৭৫টি পরিবারের সদস্যদের সাাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, তাপের কারণে বহিরাঙ্গন কর্মীরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ কার্যদিবস হারান। আর ঘরের ভেতরে কাজ করা কর্মীরা হারান ১৩ দশমিক ৫ দিন। এর ফলে তাদের বার্ষিক আয় কমে যায় যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
গবেষণার এই হিসাবের বাইরে বাস্তব চিত্র আরো কঠিন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরজমিনে দেখা যায়, তীব্র গরমে রিকশাচালক, পরিবহনশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, রঙমিস্ত্রি, হকার ও খাবার সরবরাহকারীদের অনেকেই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক ঘণ্টা কম কাজ করছেন। কেউ কাজের মাঝখানে দীর্ঘ বিরতি নিচ্ছেন, কেউ আবার অসুস্থ হয়ে পুরো দিনের কাজই বাদ দিচ্ছেন। ফলে এক দিকে কমছে শ্রমিকের আয়, অন্য দিকে কমছে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা।
জ্বালানি আমদানির বিলের সাথে তুলনীয় তি
তাপপ্রবাহজনিত ৭৭ হাজার কোটি টাকার মজুরি তির পরিমাণ দেশের অর্থনীতিতে এর ব্যাপকতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থের পরিমাণ দেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের সাথেও তুলনীয়। অর্থাৎ তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শ্রমঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা কমে গিয়ে যে অর্থনৈতিক তি হচ্ছে, তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় অদৃশ্য ব্যয়।
এ তি কোনো একটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়। শ্রমিক কম সময় কাজ করলে তার আয় কমে, উৎপাদন কমে, কাজের সময়সীমা বাড়ে এবং অনেক েেত্র নিয়োগদাতা ও শ্রমিকÑ উভয়ের ওপরই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
গবেষণায় আরো উদ্বেগজনক স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। প্রায় ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা বারবার পানিশূন্যতার সাথে সম্পর্কিত কিডনি তির উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে গরমের মৌসুমে মানসিক চাপও বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ তাপপ্রবাহের তি শুধু হারানো মজুরিতে সীমাবদ্ধ নয়। অসুস্থতার কারণে চিকিৎসাব্যয় বাড়ছে, কর্মদিবস হারাচ্ছেন শ্রমিকরা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে পরিবারের ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি আর্থিক চাপ। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের েেত্র এ চাপ আরো বেশি। কারণ তাদের অধিকাংশেরই বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা নেই।
গবেষকরা বিদ্যমান সামাজিক সুরা কর্মসূচির সাথে তাপ-সম্পর্কিত সহায়তা যুক্ত করা এবং কর্মেেত্র তাপ সুরাব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে শ্রম আইনে কর্মেেত্র তাপমাত্রার একটি নির্দিষ্ট নিরাপদ সীমা নির্ধারিত নেই বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকার দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে ঢাকার তাপসূচক জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গরমে অর্ধেকের কাছাকাছি কমছে আয়
রাজধানীর উত্তরের কামারপাড়ার বাসিন্দা চালক মানিক মিয়ার প্রতিদিনের আয় তাপপ্রবাহের কারণে কিভাবে কমছে, তারই একটি উদাহরণ।
তিনি জানান, আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন প্রায় ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এক হাজার ২০০ টাকার মতো আয় করেন। কিন্তু তীব্র গরমে টানা ছয় থেকে সাত ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো তার পে সম্ভব হয় না। ফলে দিন শেষে আয় নেমে আসে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়।
মানিক মিয়া বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে শরীর টেকে না। বেশি সময় গাড়ি চালালে মাথা ঘুরে যায়। তাই বাধ্য হয়ে কাজ কমাতে হয়। কিন্তু কাজ কমলে আয়ও কমে যায়।’
তার হিসাবে, তাপপ্রবাহের সময় প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কম আয় হচ্ছে। পাঁচ সদস্যের সংসারে এই ঘাটতি সামাল দেয়া তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর নয়াবাজারের রঙমিস্ত্রি শাহাবুদ্দিন ও সেলিম উদ্দিন জানান, প্রচণ্ড গরমে কাজের মাঝখানে অতিরিক্ত বিশ্রাম নিতে হয়। এতে নির্ধারিত আট ঘণ্টার কাজ শেষ করতে তাদের কর্মদিবস দীর্ঘ হয়ে যায়।
তারা বলেন, প্রচণ্ড গরমে প্রায় দুই ঘণ্টা কাজ করার পর ৩০ মিনিটের মতো বিশ্রাম নিতে হয়। ফলে আট ঘণ্টার কাজ শেষ করতে অনেক সময় অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় দিতে হয়।
অর্থাৎ তাপপ্রবাহ শুধু শ্রমঘণ্টা কমাচ্ছে না; অনেক েেত্র একই পরিমাণ কাজ শেষ করতে শ্রমিককে দিনের বড় একটি অংশ কর্মস্থলে থাকতে হচ্ছে।
হকারের বিক্রিও কমে যায়
ওয়ারীতে পান-সিগারেট বিক্রি করেন আব্দুল হক। স্বাভাবিক সময়ে তিনি প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা হকারি করেন। কিন্তু তীব্র গরমে সাত-আট ঘণ্টার বেশি বাইরে থাকা তার পে সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘গরম বেশি হলে মানুষও কম বের হয়, আবার নিজেরও শরীর খারাপ লাগে। তাই বাসায় ফিরে যেতে হয়। এতে বেচাকেনা যেমন কমে, আয়ও কমে যায়।’
পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে এই আয়-ঘাটতি তাকে বাড়তি চাপে ফেলছে।
ফুড ডেলিভারির কাজ করেন কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা শাকিল। স্বাভাবিক সময়ে তার শিডিউল ১২ ঘণ্টা হলেও পুরান ঢাকায় তিনি প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু তীব্র তাপদাহে তার কার্যকর কর্মঘণ্টা কমে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায় নেমে আসে।
শাকিল বলেন, ‘অতিরিক্ত গরমে বেশিণ বাইকে থাকা যায় না। শরীর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই পাঁচ-ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করা সম্ভব হয় না।’
তার আয়ও এতে প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা আয় করেন, তাপপ্রবাহে তা কমে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় নেমে আসে।
শ্রমঘণ্টার তি মানে উৎপাদনশীলতার তি
তাপদাহের কারণে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় আয় ও দেশের উৎপাদনশীলতাÑ দুই দিকেই চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন নদী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস।
তিনি বলেন, ‘এপ্রিল-মে মাসে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে তাপমাত্রা এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ফলে ইটভাটা, নির্মাণ, কৃষি ও কলকারখানার শ্রমিকরা আগের ৮-৯ ঘণ্টার পরিবর্তে অনেক সময় ৫-৬ ঘণ্টা কাজ করতে পারছেন।’
সুমন শামস বলেন, দুই-তিন ঘণ্টা কম কাজ করার অর্থ শুধু অতিরিক্ত বিশ্রাম নয়; এর সরাসরি আর্থিক মূল্য রয়েছে। একজন দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরির শ্রমিক যদি প্রতিদিন তিন ঘণ্টা কাজ কম করেন, তাহলে মাসে তার আয় কমতে পারে প্রায় সাত হাজার ২০০ টাকা। শ্রমিকের সংখ্যা কোটি ছাড়ালে জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
তার মতে, এর প্রভাব ইট, পোশাক ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে নির্মাণকাজ পর্যন্ত বিস্তৃত। কাজের সময়সীমা বাড়ে, প্রকল্পের ডেডলাইন পিছিয়ে যায় এবং নিয়োগদাতার উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। ফলে একদিকে শ্রমিকের আয় কমে, অন্যদিকে মালিকের উৎপাদন ব্যয় ও লোকসানের ঝুঁকি বাড়ে।
‘তাপপ্রবাহ এখন অর্থনৈতিক ও শ্রম-অধিকারের প্রশ্ন’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, বছরে ৭৭ হাজার কোটি টাকার প্রত্য ও পরো অর্থনৈতিক প্রভাবের হিসাবটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে। বাংলাদেশের জন্য তাপপ্রবাহ এখন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি প্রত্য অর্থনৈতিক ও শ্রম-অধিকারের প্রশ্ন।’
তার মতে, তাপপ্রবাহের তির বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করছেন দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালকসহ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা। তাদের ছুটি নেয়ার সুযোগ নেই, অধিকাংশের স্বাস্থ্যবীমা নেই এবং আয় বন্ধ হলে পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ে।
কিডনি তির উপসর্গের যে হার গবেষণায় উঠে এসেছে, সেটিকেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কসঙ্কেত হিসেবে দেখছেন তিনি। কারণ এর প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যয় শুধু চিকিৎসাব্যয়ে সীমাবদ্ধ নয়; একজন পরিবারের উপার্জনম সদস্য দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে পুরো পরিবারই আর্থিক সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে।
তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক তি নিয়ে আলোচনা সাধারণত উৎপাদনশীলতা বা জিডিপির হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতায় এর প্রভাব আরো গভীর। তীব্র গরমে একজন শ্রমিক কাজের সময় কমাতে বাধ্য হলে তার মজুরি কমে যায়; অসুস্থ হলে হারান আরো কর্মদিবস; চিকিৎসার জন্য বাড়ে পারিবারিক ব্যয়। ফলে তাপপ্রবাহের অভিঘাত একই সাথে আয়, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর পড়ে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহম্মদ ও সিনিয়র অফিসার রেজুয়ানুল হক আজমের মতে, তাপদাহকে শুধু মৌসুমি আবহাওয়াজনিত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ক্রমেই শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং অধিকারসংক্রান্ত একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
তাদের বিশ্লেষণে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন এমন মানুষ, যারা এর জন্য সবচেয়ে কম দায়ী। কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, নির্মাণশ্রমিক কিংবা শিল্পশ্রমিকÑ তাদের অধিকাংশের কাজের পরিবেশ সরাসরি তাপমাত্রার সাথে যুক্ত। অথচ তীব্র গরমে কাজ না করার মতো আর্থিক সমতা তাদের নেই।
একজন অফিসকর্মী অতিরিক্ত গরমে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কে আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু একজন রিকশাচালককে উত্তপ্ত পিচের রাস্তা, কংক্রিটের প্রতিফলিত তাপ এবং যানবাহনের ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে হয়। একজন নির্মাণশ্রমিককে খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হয়। ফলে একই তাপমাত্রার অভিঘাতও শ্রেণীভেদে এক নয়।
নীতির বড় ঘাটতি কোথায়
বাংলাদেশে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নীতিগত উদ্যোগ একেবারে নেই এমন নয়। ২০২৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় ‘ঘধঃরড়হধষ এঁরফবষরহব ড়হ ঐবধঃ-জবষধঃবফ ওষষহবংংবং’ প্রকাশ করা হয়েছে। তাপপ্রবাহজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরায় এটি গুরুত্বপূর্ণ পদপে।
তবে সমস্যা হলো, তাপঝুঁকি মোকাবেলার এই উদ্যোগ মূলত জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক। শ্রমিক কখন কাজ করবেন, কতণ কাজ করবেন, কতণ পর বিশ্রাম নেবেন, কোন তাপমাত্রায় কাজের ধরন পরিবর্তন করতে হবে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে কাজ সাময়িক বন্ধ রাখতে হবেÑ এসব প্রশ্ন এখনও শ্রমনীতি ও কর্মেেত্রর নিরাপত্তা কাঠামোয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্মেেত্র অতিরিক্ত তাপমাত্রাকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে তাপমাত্রাভিত্তিক কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস, বাধ্যতামূলক বিরতি, হিট অ্যাকশন প্ল্যান এবং কর্মস্থলে পর্যাপ্ত পানি ও ছায়ার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশের েেত্রও একই ধরনের ব্যবস্থা এখন প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ^াস মনে করেন, কর্মেেত্র তাপঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন। সেখানে তাপমাত্রার নির্দিষ্ট সীমা অনুযায়ী কর্মঘণ্টা সমন্বয়, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, নিরাপদ পানীয় জল, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কী করা যেতে পারে
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় কয়েকটি ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রথমত, তাপজনিত ঝুঁকিকে শ্রম আইন ও পেশাগত স্বাস্থ্য-নিরাপত্তা কাঠামোর স্পষ্ট অংশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন খাতের জন্য তাপমাত্রাভিত্তিক কর্মপরিবেশ নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বা তাপসূচক অতিক্রম করলে কর্মঘণ্টা কমানো, বাধ্যতামূলক বিরতি কিংবা কাজ সাময়িক বন্ধ রাখার বিধান থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নির্মাণস্থল, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ড, শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য শ্রমঘন এলাকায় নিরাপদ পানীয় জল, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, শ্রমিক ও তদারককারীদের হিটস্ট্রেস, ডিহাইড্রেশন, হিট এক্সহস্টশন ও হিটস্ট্রোকের লণ সম্পর্কে প্রশিণ দিতে হবে।
পঞ্চমত, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন। তীব্র তাপপ্রবাহের সময়ে কাজের সুযোগ কমে গেলে বা কর্মঘণ্টা কমাতে বাধ্য হলে ল্যভিত্তিক নগদসহায়তা দেয়া যেতে পারে। ষষ্ঠত, কৃষি ও নির্মাণ খাতে কাজের সময় পুনর্বিন্যাস করে দিনের সবচেয়ে উষ্ণ সময় এড়িয়ে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
সবশেষে, তাপপ্রবাহকে জলবায়ু ও পরিবেশের বিষয় হিসেবে দেখার পাশাপাশি শ্রম ও অর্থনীতির বিষয় হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ তীব্র গরমে একজন শ্রমিকের হারানো প্রতিটি কর্মঘণ্টার সাথে তার পরিবারের আয় কমে, দেশের উৎপাদন কমে এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়।



