বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাস্তবতার কঠিন সমীকরণে এই লক্ষ্য এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। সরকারের নীতিগত ঘোষণা, আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাত প্রত্যাশিত গতি পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাজার হাজার অকার্যকর সৌর প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, তীব্র জমি সঙ্কট, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্য বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের পথে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্য বনাম বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮,০০০ মেগাওয়াটের বেশি। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মোট সক্ষমতার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ (যার সিংহভাগ সৌরবিদ্যুৎ)। জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এই অগ্রগতির হার অত্যন্ত ধীর এবং হতাশাজনক।
অকার্যকর সোলার ও বর্জ্য ঝুঁকি
গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশে লক্ষাধিক সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলেও তার একটি বড় অংশই এখন অকেজো। গ্রামীণ এলাকায় ‘আইডিকল’-এর মাধ্যমে একসময় ৬০ লাখের বেশি সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছিল, যা ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচি। কিন্তু বর্তমানে ব্যাটারি নষ্ট, ইনভার্টার বিকল এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর উল্লেখযোগ্য অংশই পুরোপুরি অকার্যকর। তাছাড়া ব্যাটারি পরিবর্তনের উচ্চ খরচ বহন করতে না পেরে অনেক প্রান্তিক গ্রাহক সিস্টেমগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এনার্জি স্টাডিজের গবেষণা অনুযায়ী, আয়ুষ্কাল শেষ হওয়া এসব প্যানেল ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই। ফলে ভবিষ্যতে এগুলো মারাত্মক পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
জমি সঙ্কট ও নীতিগত সমন্বয়হীনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৩ থেকে ৫ একর জমির প্রয়োজন। জনবহুল বাংলাদেশে কৃষিজমি সংরক্ষণ, বসতি ও শিল্পায়নের চাপে এই বিপুল পরিমাণ ফঁাঁকা জমি পাওয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্রেডার কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ, ভূমি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, এলএনজি এবং উচ্চমূল্যের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে সরকারের অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকা এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-ভিত্তিক নীতির কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত প্রয়োজনীয় প্রণোদনা পাচ্ছে না।
নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও অর্থনৈতিক সঙ্কট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন : ‘শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেয়ার প্রবণতায় মানের চেয়ে ব্যয় কমানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে, যার ফলে কয়েক বছরেই প্যানেলগুলো অকেজো হয়ে পড়ছে।” পাশাপাশি, দেশের সৌর খাতের যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় সাম্প্রতিক ডলার সঙ্কট, এলসি জটিলতা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে সীমিত করেছে।
গ্রিড সীমাবদ্ধতা ও শিল্পখাতের অনীহা
আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে তৈরি পোশাক শিল্প (বিজিএমইএ) পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে আগ্রহী হলেও উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া, সৌরবিদ্যুৎ আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর জন্য উন্নত স্মার্ট গ্রিড ও ব্যাটারি স্টোরেজ প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে এখনো গড়ে ওঠেনি।
আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার তথ্যমতে, গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৮০ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশ এর সুবিধা নিতে পারছে না। এই স্থবিরতা কাটাতে বিশেষজ্ঞরা যেসব পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন সেগুলো হলো- শুধু ফসলি জমির ওপর নির্ভর না করে কারখানার ছাদ (রুপটপ সোলার), খাল ও জলাশয়ে ভাসমান সৌর প্রকল্প এবং সরকারি ভবনে সোলারাইজেশন বাড়ানো। আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয়ভাবে সৌর যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্প গড়ে তোলা। বিনিয়োগবান্ধব নীতি, কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ রোডম্যাপ তৈরি করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এখন আর কেবল অর্থনৈতিক বিকল্প নয়, বরং টিকে থাকার লড়াই। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প শুধু অকার্যকর প্যানেলের স্তূপই বাড়াবে, কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হবে না।



