বিশ^ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকার আসবে তার সাথে কাজ করার জন্য অপেক্ষায় আছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ^ব্যাংকের পক্ষ থেকে বাজেট সহায়তা ও আইএমএফের পক্ষ থেকে পূর্বে নেয়া ঋণের কিস্তি ছাড় করা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে আইএমএফের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে ৫৫০ কোটি ডলার ঋণের ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি তারা এক সাথে ছাড় করবে। এটি করা হবে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর নির্বাচিত যে সরকার আসবে তাদের সময়। সেটি আগামী মার্চ বা এপ্রিল মাসে হতে পারে। ওদিকে, বিশ^ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা বাংলাদেশকে বাজেট সহায়তা দিতে আগ্রহী। এ বিষয়ে তারা নির্বাচিত সরকারের সাথে আলোচনা করতে ইচ্ছুক। সংস্থাটি বাজেট সহায়তা হিসেবে আপাতত ৩০ থেকে ৫০ কোটি ডলার দিতে চায় বলে সূত্র জানায়। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে আগামী যে সরকার ক্ষমতায় আসবে তার যোগাযোগ কৌশলের ওপর।
এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দু’টি সংস্থার পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করার সুযোগ পাবে। সংস্থা দু’টি আগামী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই ঋণের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু করার কথা আমাদের জানিয়েছে। আলোচনা করার জন্য তাদের পক্ষ থেকে পৃথক দু’টি টিমও পাঠানো হতে পারে।
এ দিকে এর আগে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশংসা করেছিল আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং সংস্কার এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে অর্থনীতি দুর্বল কর রাজস্ব, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রমবর্ধমান সামষ্টিক-আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বৈশি^ক ঋণদানকারী এই সংস্থা।
আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজস্ব স্থায়িত্ব এবং সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও শক্তিশালীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের জন্য রাজস্ব ও আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহসী নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্য থাকে, বিশেষ করে যদি নীতিগত প্রতিক্রিয়া বিলম্বিত বা অপর্যাপ্ত হয়। তাই মধ্যমেয়াদে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন অর্জনের জন্য শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, যুব বেকারত্ব নিরসন এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার আইএমএফ উল্লেখ করেছে, ‘কর্তৃপক্ষ (অথোরিটি) সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বহিঃস্থ ভারসাম্যহীনতা কমাতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে, কর্তৃপক্ষ রাজস্ব এবং আর্থিক নীতি উভয়কেই কঠোর করেছে।
আইএমএফ মনে করে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশে ত্বরান্বিত হবে। ২০২৭ অর্থবছরে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৮ শতাংশে বৃদ্ধি পাওয়ার আগে ২০২৬ অর্থবছরে ৫.৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রাজস্ব ও ব্যাংকিং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিলম্বিত বা অপর্যাপ্ত নীতিগত পদক্ষেপ প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করবে, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি করবে এবং সামষ্টিক-আর্থিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়াবে।’
ব্যাংকিং খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আর্থিক খাতের সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে আইএমএফ বলেছে, ‘দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ব্যাপকভাবে মোকাবেলা করার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সরকারমুখী কৌশলের মধ্যে সিস্টেমমুখী কম মূলধনীকরণের অনুমান, আর্থিক সহায়তার সুযোগ এবং চিহ্নিত তহবিল উৎসসহ আইনত শক্তিশালী পুনর্গঠন এবং সমাধানের বিকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এ ছাড়াও সম্পদের মান পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিতে সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোর শাসনব্যবস্থা এবং ব্যালেন্স শিটের স্বচ্ছতা উন্নত করার জন্য, আর্থিক সুরক্ষা জালকে শক্তিশালী করার জন্য এবং অ-কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামো উন্নত করার জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংকগুলোর সাথে মোকাবেলা করার যেকোনো পদ্ধতির মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে সুস্থ ব্যালেন্স শিট, টেকসই লাভজনকতা এবং পর্যাপ্ত তরলতা নিশ্চিত করা উচিত।
মুদ্রাস্ফীতি কমানোর ওপর মুদ্রানীতির জোর অব্যাহত রাখা উচিত বলে মনে করে আইএমএফ। মুদ্রাস্ফীতির ধীরগতি হ্রাস মুদ্রাস্ফীতি পাঁচ-ছয় শতাংশের লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে না আসা পর্যন্ত কঠোর আর্থিক অবস্থা বজায় রাখার দাবি রাখে। নতুন বিনিময় হার ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করা উচিত, যার মধ্যে বর্ধিত নমনীয়তা বৃদ্ধি করাও অন্তর্ভুক্ত। মুদ্রানীতির কার্যকারিতা উন্নত করার জন্য, কর্তৃপক্ষের উচিত অ-মানক মুদ্রা এবং আধা-রাজস্ব কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা।
আইএমএফ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ অনুমোদন করে। গত বছরের জুনে ঋণের চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি ছাড় করেছে। সেইসাথে ঋণের মেয়াদ ছয় মাস ও ঋণের পরিমাণ ৮০ কোটি ডলার বাড়িয়েছে। এ নিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি ডলারে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩৬০ কোটি ডলার পেয়েছে।



