একীভূত পাঁচ ব্যাংকের যাত্রা শুরু আগামী সপ্তাহে : গভর্নর

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • লুটেরাদের শাস্তি দিন, কারখানা বন্ধ করা যাবে না : মির্জা ফখরুল
  • অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই মূল : ডা: শফিক

একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক নিয়ে নতুন ব্যাংকের যাত্রা আগামী সপ্তাহেই শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমাদের অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল। ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ ব্যাংক নিয়ে আমরা একটি নতুন ব্যাংক করতে যাচ্ছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এ ব্যাংকের লঞ্চিং (যাত্রা শুরু) হয়ে যাবে।

গতকাল শনিবার চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। ‘ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সামষ্টিক অর্থনীতি’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন গভর্নর। অনুষ্ঠানটির আয়োজক ছিল দৈনিক বণিক বার্তা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন পত্রিকাটির সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ও সুজনের সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার।

একীভূত ব্যাংকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এর চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক আর হবে না। সরকারের সাহায্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একটি সবল ব্যাংক তৈরি করব আমরা। তিনি বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, সরকার যখন ৮ শতাংশ খেলাপি ঋণের কথা বলেছে, আমি ভেবেছিলাম এ হার তিনগুণ তথা ২৫ শতাংশ হতে পারে। এখন দেখি তা ৩৫ শতাংশ। পুরো ঋণের দু-তৃতীয়াংশ নিয়েই ব্যাংকগুলোকে চালাতে হচ্ছে। আমাদের ধাপে ধাপে এ সমস্যা থেকে উঠে আসতে হবে।

মূল্যস্ফীতির তুলনায় বর্তমান নীতি সুদহার বেশি নয় বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, আমাদের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ শতাংশ ছিল। সে তুলনায় নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বেশি নয়। ভারত, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের তুলনায় সুদহারের পার্থক্য খুব বেশি নয়।

এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে। চোর ধরার চিন্তা থেকে বেরিয়ে বিশ্বাসের জায়গায় আসতে হবে। তাকে যদি বিশ্বাস না-ই করি তাহলে ব্যবসা করে তারা দেশের জন্য কী করবে।

দেশ ছেড়ে পলাতকদের বন্ধ কারখানাগুলো আবার কিভাবে চালু করা যায়, সেটি ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর যারা ব্যাংক লুট করেছে, দেশে লুটপাট করেছে, চুরি করেছে তাদের ধরেন, শাস্তি দেন। কিন্তু তাদের যে শিল্পকারখানা আছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। আলোচনায় এসেছে ১৪ লাখ মানুষ কর্ম হারিয়েছে, তারা যাবে কোথায়? আমরা এই বেকারত্ব সৃষ্টি করছি কেন? আমি মনে করি বিষয়টি আমাদের ভেবে দেখা উচিত। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এ দেশের অর্থনীতিতে গরিব-দুঃখী সবাই অবদান রেখে যাচ্ছে। আমাদের টোটাল ডেভেলপমেন্ট দুটো বড় খাত থেকে আসে; একটা বিভিন্ন পর্যায়ের ট্যাক্স, আরেকটা রেমিট্যান্স। ভিক্ষুক, শিল্পপতি এমনকি নবজাতক শিশুকেও ট্যাক্স দিতে হয়। যেহেতু সমাজের দায়িত্ব সবাই সমানভাবে নিচ্ছে, সেহেতু অর্থনৈতিক বিষয়টিও ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

১৮ কোটি মানুষকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে ঝরে পড়া বা ড্রপ-আউট রোধ করার তাগিদ দেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, আগামী দিনের অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কিংবা দেশ পরিচালনার ভার তুলে নেয়ার মতো সম্পদকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সমাজ ও সরকার উভয়ের।

অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ অর্থনীতিতে যেমন বিভিন্ন সরকারি মারপ্যাঁচ, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে, তেমনি সেখানে অনেক দুর্বৃত্তপনাও আছে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা দাঁড় করাতে অনেক জটিলতা পার করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে এ দুর্বৃত্তপনাকে রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। চাঁদা ও দুর্নীতি দেশীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও নানাভাবে নিরুৎসাহিত করে বলে জানান জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আমরা যখন বলি আমাদের ব্যাপক মানবসম্পদ আছে, উৎপাদন ব্যয় কম হবে, বেশি লাভ করতে পারব তখন তারা সুষ্ঠু পরিবেশ চায়।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, রাজনীতির বাইরে কোনো অর্থনীতি নাই। সব নীতি সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ ও বিকশিত করবে রাজনীতি। ব্যবসায়ীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রাজনীতির জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আমরা কাক্সিক্ষত কম্ফোর্ট জোন ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি করতে পারিনি। তিনি বলেন, আমাদের ফোকাস তিনটা জায়গায়। এক নাম্বার শিক্ষা; তবে সনদ প্রদানের শিক্ষা নয়, প্রফেশনাল এডুকেশন দিতে হবে। কৃষক থেকে শুরু করে সবাই হবে একেকজন রিসোর্স ও দক্ষ পারসন। দুই নম্বর হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ, আর তৃতীয়টি ন্যায়বিচার, সর্বত্র ও সবার জন্য। এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের ব্যবসা হবে টেকসই। জাতি হবে প্রগ্রেসিভ ও ডায়নামিক।

‘অর্থনীতিতে ন্যায্যতা’ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন। এ অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন সাবেক সিনিয়র সচিব মো: শফিউল্লাহ। এ সময় তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’ এ সময় লক্ষ্যে পৌঁছার কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিগত সরকার দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণী ক্ষমতায় ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও আকাক্সক্ষা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়েছে। তবে সময়ের সাথে সমাজের বৃহত্তর জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠায় জুলাইয়ের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। যেখানে তরুণরা ন্যায্য অধিকার ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় সংগ্রামে নেমেছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষা উপেক্ষিত হলে নতুন করে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’