কৃষিতে ছয় মাস : উদ্যোগ আছে, স্বস্তি নেই

কৃষক কার্ড, ঋণ মওকুফ ও খাল পুনঃখননে অগ্রগতি; সার, উৎপাদন ব্যয়, বাজার সিন্ডিকেট ও দক্ষ নেতৃত্বের সঙ্কট বড় চ্যালেঞ্জ

নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই সময়ে কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিন্তু কৃষকের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। সার সরবরাহ ও দাম, পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃষি খাতের দক্ষ নেতৃত্বের সঙ্কট বড় বাধা হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত একটি খাতকে মাত্র ছয় মাসে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

কাওসার আজম
Printed Edition

নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই সময়ে কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণসহ বেশ কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিন্তু কৃষকের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। সার সরবরাহ ও দাম, পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয়, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং কৃষি খাতের দক্ষ নেতৃত্বের সঙ্কট বড় বাধা হয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষতিগ্রস্ত একটি খাতকে মাত্র ছয় মাসে ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব নয়। তবে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

কৃষক কার্ডে বড় উদ্যোগ

প্রথম ছয় মাসে কৃষি খাতে সরকারের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ ‘কৃষক কার্ড’ সাড়া ফেলে। প্রকৃত কৃষকদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এরই মধ্যে ১২ লাখ ৫০ হাজার কৃষকের তথ্যভাণ্ডার প্রস্তুত হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে ৪৩ লাখ এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাক-পাইলট পর্যায়ে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষককে কার্ড দেয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) পার্টনার প্রকল্পে ২০২৩ সালে কৃষক কার্ডের জন্য প্রায় ৭২১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আগের সরকার ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এর বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে উদ্যোগটি এগিয়ে নিচ্ছে।

ঋণ মওকুফ ও খাল পুনঃখননে অগ্রগতি

প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বস্তি দিতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ একুশে পদকপ্রাপ্ত ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম খান এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তার মতে, ঋণ মওকুফের পাশাপাশি সহজ শর্তে নতুন ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি, উৎপাদন উপকরণ এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

সেচে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে নদী-খাল পুনঃখননেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে ৪৭৮ দশমিক ৯ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৭৫ দশমিক ৬১ কিলোমিটার, অর্থাৎ ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় পর্যায়ে ২০ হাজার কিলোমিটার এবং কৃষি খাতে ছয় হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের লক্ষ্য রয়েছে।

পরিবেশ ও কৃষির ভারসাম্য রক্ষায় ছয় মাসে ২৫ লাখ গাছের চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে তিন কোটি চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি শস্যবীমার খসড়া, সার নীতিমালা সংশোধন, কীটনাশকের ক্ষতি কমাতে পরামর্শক কমিটি এবং উত্তরাঞ্চলে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

সার সঙ্কটই সবচেয়ে বড় চাপ

নীতিগত উদ্যোগের বিপরীতে কৃষি খাতে সবচেয়ে বড় চাপ এখন সার ব্যবস্থাপনায়। ডিএপি, টিএসপি ও এমওপির মজুদ নিরাপদ সীমার নিচে নেমেছে। বর্তমানে ডিএপি রয়েছে তিন লাখ ৯০ হাজার টন, যেখানে নিরাপদ মজুদ পাঁচ লাখ টন। টিএসপি রয়েছে তিন লাখ ৫৩ হাজার টন, নিরাপদ মজুদ চার লাখ টন। এমওপি রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার টন, নিরাপদ মাত্রা তিন লাখ টন। বিপরীতে ইউরিয়ার মজুদ পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি।

ডিএপির ঘাটতি কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিএডিসি। আমন ও পরবর্তী শীতকালীন ফসলের মৌসুম সামনে রেখে দ্রুত আমদানি না হলে পরিস্থিতি সংকটে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতাও কমেছে। কয়েকটি সরকারি সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা জরুরি। তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের কৃষিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

‘বিধ্বস্ত কৃষি খাত ছয় মাসে পুনর্গঠন কঠিন’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যথাযথ নেতৃত্বের ঘাটতি ও অদক্ষ জনবল দিয়ে খাতটি পরিচালিত হওয়ায় সমস্যা আরো বেড়েছে। ফলে মাত্র ১৮০ দিনে এত বড় ক্ষতিগ্রস্ত খাতকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড় করানো কঠিন।

তিনি বলেন, সারের সঙ্কটও নতুন সরকারের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। পতিত আওয়ামী আমলসহ কয়েক বছর ধরে সার সরবরাহে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। আগের সরকার ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। নতুন সরকারের সময় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সার আমদানিতে আরো জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সার এখনো বড় ইস্যু।

তবে আনোয়ার ফারুক বলেন, নির্বাচনের আগে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কাজ শুরু হয়েছে। কমিটমেন্ট অনুযায়ী কাজ শুরু সরকারের ইতিবাচক দিক।

দক্ষ নেতৃত্বের সঙ্কট

আনোয়ার ফারুকের মতে, কৃষি খাতের বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ দক্ষ জনবলের সঙ্কট। প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সেক্টরকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে। কৃষি প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদের এই সঙ্কট নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, যোগ্য উত্তরসূরি, গুরুত্বপূর্ণ পদে দক্ষ ও যোগ্য লোক বসানো না গেলে কৃষি খাতের সংস্কার এগিয়ে নেয়া কঠিন হবে।

উৎপাদন ব্যয় কমেনি

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও উৎপাদন ব্যয় বড় সমস্যা। পোলট্রি, গবাদিপশু ও মাছের খাদ্যের দাম এখনো উচ্চ। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের মূল্য, ডলার ও জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রভাব পড়ছে খাদ্যের দামে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। ডিম, গোশত ও দুধের দাম সবসময় উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ায় খামারিদের মুনাফা কমছে।

কৃষিপণ্যের বাজারেও একই সমস্যা। উৎপাদক থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অথচ ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। বাজার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সরবরাহব্যবস্থা স্বচ্ছ এবং কৃষককে সরাসরি বাজারের সাথে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কমছে কৃষি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি

দীর্ঘমেয়াদে আরো বড় উদ্বেগ কৃষি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া। ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, কয়েক দশক ধরে কৃষি উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশের ওপরে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা দুই শতাংশের ঘরে নেমেছে। ফলে চাল ও গমের আমদানিনির্ভরতা কমছে না। উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, সেচ, উন্নত বীজ, যান্ত্রিকীকরণ ও বাজার সুবিধাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

অবশ্য খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। চাল ও শাকসবজির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল হয়েছে এবং কিছু পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় কমেছে বলে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন। তবে এ স্বস্তি স্থায়ী নয়; বাজার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা না থাকলে মূল্যস্ফীতি ফের গতি পাবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও নেতৃত্ব সঙ্কট

কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব সঙ্কটও খাতটির অগ্রগতিতে বাধা হয়ে আছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মহাপরিচালক, পরিচালক ও নির্বাহী চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন রুটিন দায়িত্বে পরিচালিত হওয়ায় গবেষণা পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণে স্থবিরতার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ অনেক

সব মিলিয়ে প্রথম ছয় মাসে সরকারের কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকলেও কৃষকের মূল অর্থনৈতিক সঙ্কট এখনো কাটেনি। কৃষক কার্ড, ঋণ মওকুফ, খাল পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণ ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সার, উৎপাদন ব্যয়, বাজারব্যবস্থা, খামারিদের ব্যয়, কৃষি গবেষণার নেতৃত্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকের ভাষায়, এখন বড় সমস্যা সিদ্ধান্তহীনতা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে না পারার কারণে বাস্তবায়নও পিছিয়ে যাচ্ছে। কৃষি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমে যোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এরপর সার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উপকরণ, বাজারব্যবস্থা ও উৎপাদন ব্যয়ের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।