খেলাপি গ্রুপের বাধা কাটিয়ে শাইনপুকুরকে এলসি সুবিধা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শাইনপুকুর সিরামিকসকে বিশেষ নিয়ন্ত্রক সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রুপটি ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ হওয়ায় যে আইনি জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা বন্ধ হয়ে পড়েছিল, তা নিরসনে নির্দিষ্ট শর্তে শতভাগ মার্জিনের ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭ক(৩) ধারার বিধান শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে শতভাগ নগদ মার্জিন জমা দিয়ে শুধু উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারবে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই সুবিধার আওতায় কোনো ধরনের ঋণ, অর্থায়ন বা দায়ের ক্ষেত্রে সরকার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো গ্যারান্টি বা আর্থিক দায় নেবে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের অর্থায়ন আদায় না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা দাবি করতে পারবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ঋণগ্রহীতার অনুকূলে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন ঋণ সুবিধা বা অর্থায়ন দিতে পারে না। বেক্সিমকো গ্রুপ ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ হওয়ায় গ্রুপভুক্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একই আইনি সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শাইনপুকুর সিরামিকসের কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা কার্যত স্থবির হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শাইনপুকুর সিরামিকস নিজে পৃথকভাবে ঋণখেলাপি নয়। কিন্তু একই গ্রুপের সদস্য হওয়ায় ব্যাংকগুলো আইনগত ঝুঁকির কারণে প্রতিষ্ঠানটির এলসি খুলতে অনীহা দেখায়। এতে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হয়।

বেক্সিমকোর কোম্পানিকে সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে আইনের ব্যতিক্রম প্রয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য একটি ব্যতিক্রমী বিধান রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলেও, যদি সেই খেলাপি ইচ্ছাকৃত না হয় অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে, তাহলে একই গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খেলাপি হিসেবে গণ্য করা হবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং সুবিধা দেয়া যেতে পারে। সেই বিধান অনুসারেই শাইনপুকুর সিরামিকসকে বিশেষ অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলো জানায়, শাইনপুকুর সিরামিকসের আবেদন পর্যালোচনার পর বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয়ের সম্মতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। তবে সুবিধাটি কেবল কাঁচামাল আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ, সম্প্রসারণ বা অন্য কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা এই অব্যাহতির আওতায় থাকবে না। এ ছাড়া এলসি খোলার ক্ষেত্রে শতভাগ নগদ মার্জিন জমা দেয়ার শর্ত আরোপ করায় ব্যাংকের ঋণঝুঁকিও কার্যত সীমিত থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, এর আগে একই ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছিল আবদুল মোনেম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম সুগার রিফাইনারিকে। ওই প্রতিষ্ঠানও গ্রুপভিত্তিক ঋণখেলাপির কারণে ব্যাংকিং জটিলতায় পড়েছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরের জন্য বিশেষ অব্যাহতি দিয়ে শতভাগ মার্জিনের ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলার অনুমতি দেয়। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানার কার্যক্রম সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইনগত কাঠামোর মধ্যেই এ ধরনের সীমিত অব্যাহতির পথ ব্যবহার করছে। তবে একই সাথে তারা মনে করেন, খেলাপি গ্রুপের প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সমতা এবং অভিন্ন নীতিমালা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও সমান সুযোগের দাবি উঠতে পারে।