মাঝে মধ্যে ভূমিকম্প হলেও সহনীয় ভবন নির্মাণে উদাসীনতা

বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেট এবং ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের ভূমিকম্প। কারণ এ টেকটোনিক প্লেটগুলো একটার সাথে আরেকটার প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে, একটার নিচে আরেকটা ঢুকে যাচ্ছে। তা থেকেই যে কোনো সময় সংঘটিত হতে পারে বড় ধরনের ভূমিকম্প।

হামিম উল কবির
Printed Edition

বাংলাদেশে মাঝে মধ্যেই মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে। ঝুঁকি মোকাবেলায় তৎপরতা খুবই সীমিত। মৃদু ভূমিকম্প হলে কোনো নড়াচড়া নেই, এটা খুব কম মানুষ বুঝতে পারে। একটু বেশি মাত্রায় ভূমিকম্প হলেই মিডিয়াগুলো কয়েকদিন এটা নিয়ে নিউজ করে। ফলে সরকারের সংশ্লিষ্টরা নড়ে-চড়ে ওঠে, নানা প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু কিছু দিন পর আবার আগের মতোই সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়। ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেট এবং ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের ভূমিকম্প। কারণ এ টেকটোনিক প্লেটগুলো একটার সাথে আরেকটার প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ হচ্ছে, একটার নিচে আরেকটা ঢুকে যাচ্ছে। তা থেকেই যে কোনো সময় সংঘটিত হতে পারে বড় ধরনের ভূমিকম্প।

প্রকৌশলীরা বলছেন, ভূমিকম্প হলে তা ঠেকানো সম্ভব নয় তবে তা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলে। কিন্তু বাংলাদেশে বিশেষ করে শহরগুলোতে বিএনবিসি অনুসরণ না করে প্রচুর ভবন তৈরি হচ্ছে খরচ কমিয়ে আনার জন্য। এই ভবনগুলোই একটু বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ধসে পড়ার আশঙ্কা বেশি। তাছাড়া হাইরাইজ ভবনও ধসে যেতে পারে সামান্য কিছু ভুলের কারণে। এ ব্যাপারে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমদ আনসারী বলেন, সামান্য কিছু বেশি খরচের ভয়ে অনেক ভবন মালিক দুর্বল ভবন তৈরি করছেন। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ে। বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটনের সময় চলে এসেছে। সাধারণত প্রতি ১০০ বছর বা এর কিছু কম-বেশি সময়ের মধ্যে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে। বাংলাদেশ অঞ্চলে শেষ বড় ভূমিকম্পটি হয়েছে শ্রীমঙ্গলে ১৯১৮ সালে ৭.৬ মাত্রার। অবশ্য গত বছর (২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর) নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়ে গেছে। এরপরও ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ৭ মাত্রা অথবা এর চেয়ে বেশি ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের অনেক ভবনই দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা কম। অধ্যাপক আনসারী বলেন, ভূঁমিকম্পের ঝুঁকি থেকে নিজের রক্ষা করতে বিএনবিসি অনুসরণ করে যথাযথ ভবন তৈরি করতে পারলে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

প্রকৌশলীরা বলছেন, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আশপাশের সক্রিয় ফল্টলাইন এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ঝুঁকির মাত্রা বাড়লেও ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন নির্মাণ এবং পুরনো ভবনকে ভূমিকম্প-সহনীয় করে তোলার উদ্যোগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।

ঢাকা শহরে বহু ভবন রয়েছে যেগুলো অনেক পুরনো, তখন অবশ্য বিএনবিসি তৈরি হয়নি। পুরনো ভবনগুলো বড় মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার সম্ভবনা কিন্তু এই ভবনগুলোতে কিছু অর্থ খরচ করলেই সেগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় করে তোলা সম্ভব বলে অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানিয়েছেন। অন্যদিকে নতুন ভবন নির্মাণ করার ক্ষেত্রে অনেক মাটি পরীক্ষা করা ছাড়াই, নকশা পাস করা ছাড়াই তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আবার এসব ভবনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার, অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে নিজের মতো ভবন নির্মাণ, নির্মাণ কাজের যথাযথ তদারকির অভাবে নতুন ভবনগুলো ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়ে যাচ্ছে।

ভূমিকম্পে সহনীয় ভবন নির্মাণ করতে চাইলে ডাকটাইল ডিজাইন, শিয়ার ওয়াল, শক্তিশালী কলাম, উন্নত সংযোগ ব্যবস্থা, বেসলাইন আইসোলেমন এবং ড্যাম্পারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। বিএনবিসিতে এমন নির্দেশনা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। বিম কিছু দুর্বল হলেও শক্তিশালী কলামের কারণে বড় ভূমিকম্পেও ভবন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় সংঘটিত ভূমিকম্পে এমন ঘটনা সামনে এসেছে। ভূমিকম্পের শক্তি শোষণ করে বিমগুলো ভেঙে পড়লেও শক্তিশালী কলামের কারণে ভবনগুলো ধসে পড়ে না।

প্রকৌশলীরা বলছেন, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে শক্তিশালী করার বা রেট্রোফিট করার কার্যক্রম হাতে নেয়া ঢাকার পুরনো অথচ ঐতিহ্যবাহী অনেক ভবন রক্ষা পেতে পারে বড় ভূমিকম্প হলেও। বিশ্বের অনেক দেশ পুরনো ভবনে অতিরিক্ত শিয়ার ওয়াল, স্টিল ব্রেসিং, কলাম জ্যাকেটিং বা কার্বন ফাইবার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সরকারিভাবে নির্দেশনা দেয়া হলে অথবা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইন করা হলে ভবনগুলো যেমন রক্ষা পাবে তেমনি বড় ধরনের ভূমিকম্প হলেও প্রাণহানী কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন প্রকৌশলী রফিকুল আলম।