খাদিজা বিনতে জহির (সুমাইয়া)
বর্তমান যুগে দ্বীনি শিক্ষা শুধু একটি ধর্মীয় বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার ভিত্তি। দ্বীনি শিক্ষা মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেয়, তার সৃষ্টি-জগতের উদ্দেশ্য বোঝায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার দিকনির্দেশনা দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-‘বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না- তারা কি সমান হতে পারে?’ (সূরা আয-জুমার-৯) এই আয়াত একই সাথে ‘দ্বীনি ও উপকারী জ্ঞানের’ শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট করে।
হজরত আনাস ইবনে মালেক রা: থেকে বর্ণিত একটি বহুল প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসূল সা: জ্ঞানার্জন করাকে প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ’ (ইবনে মাজাহ-২২৪) এখানে ‘ইলম তথা জ্ঞান’ বলতে কেবল পার্থিব জ্ঞান নয়; বরং সর্বাগ্রে বোঝানো হয়েছে ‘দ্বীনি জ্ঞান’ যা মানুষকে তার স্রষ্টার সার্বভৌমত্বের সাথে পরিচয় করায়, হালাল-হারাম জানায় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী নীতি অনুসরণের শিক্ষা দেয়।
বর্তমান সময়ের মুসলিম সমাজে দ্বীনি শিক্ষার অভাব লক্ষ করা যায় ভয়াবহভাবে। আধুনিক শিক্ষার প্রসারে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি হয়েছে; তেমনি মুদ্রার অপর পিঠে নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় উদাসীনতা ও আত্মিক শূন্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে মুসলিম জাতি তাদের প্রকৃত পরিচয় থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
আজ প্রয়োজন দ্বীনি শিক্ষাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা-যেখানে ধর্ম ও দুনিয়ার শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক হবে। দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত হয়ে উঠবে, আর এটিই হচ্ছে ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
দ্বীনি শিক্ষার চ্যালেঞ্জ : দ্বীনি শিক্ষা ইসলামী সমাজের প্রাণশক্তি। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এই শিক্ষাব্যবস্থা নানা দিক থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নিচে প্রধান কয়েকটি চ্যালেঞ্জ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলো-
আধুনিকতার নামে দ্বীনি শিক্ষার অবমূল্যায়ন : বর্তমান সমাজে ‘আধুনিক শিক্ষা’ বলতে বোঝানো হয় কেবল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পেশাগত জ্ঞান। ফলে অনেক অভিভাবক দ্বীনি শিক্ষাকে গুরুত্বহীন মনে করেন। অভিভাবকরা সন্তানদের শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজকে অগ্রাধিকার দেন; কিন্তু মাদরাসা বা ইসলামী পাঠক্রম থেকে দূরে রাখেন। ফলাফল- নতুন প্রজন্ম দুনিয়ার জ্ঞানার্জন করলেও নৈতিকতা, তাকওয়া ও মানবিকতা হারাচ্ছে। অন্য দিকে যারা শুধু দ্বীনি শিক্ষায়ই আত্মনিয়োগ করেছে, তারা সমাজের তথাকথিত ‘মূলধারা’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। যা একটি বড় সঙ্কট।
পাঠ্যক্রম ও দক্ষতার সীমাবদ্ধতা : অধিকাংশ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে এখনো শত বছর আগের পাঠ্যসূচি চালু আছে। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির- এ রকম মৌলিক বিষয়গুলোর দারস প্রদান করা হলেও সমসাময়িক আইন, অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি বা প্রশাসনিক দক্ষতার শিক্ষা নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা সমাজে নেতৃত্ব দেয়ার বা সরকারি-বেসরকারি খাতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এমনকি অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থী ইংরেজি বা কম্পিউটার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাও রাখে না, যা বর্তমান এআই যুগে তাদেরকে বাস্তবজীবনে পিছিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সঙ্কট ও অবকাঠামোগত দুরবস্থা : আধুনিকায়নের এই যুগে এসেও বাংলাদেশসহ বহু দেশে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো অর্থনৈতিকভাবে দান-সাদকা-নির্ভর। অধিকাংশ মাদরাসার শিক্ষকরা মাসে খুব অল্প পরিমাণে সম্মানি পান, অনেক সময় সেটি নিয়মিতও পান না। শিক্ষালয়ের এই আর্থিক দুরবস্থা শুধু শিক্ষকদের মনোবল ভেঙে দেয় না; বরং মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রদানেও বাধা সৃষ্টি করে। অপর্যাপ্ত ভবন, আবাসনের সঙ্কট, আসবাবপত্রের অভাব, প্রযুক্তিহীন শ্রেণীকক্ষ- এসব কারণেও শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক বিভ্রান্তি : বিশ্বায়নের প্রভাবে বর্তমানে মিডিয়া ও শিক্ষানীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। দ্বীনি শিক্ষাকে নির্দিষ্ট কিছু টপিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের মনে এমন ধারণা জন্ম নিচ্ছে, ধর্ম শুধু নামাজ-রোজায় সীমাবদ্ধ, জীবনের বাকি অংশে এর কোনো ভূমিকা নেই। এই ভুল ধারণা দ্বীনি শিক্ষা থেকে প্রতিনিয়ত তাদেরকে বিমুখ করছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমে ইসলামবিরোধী বক্তব্য ও বিকৃত ব্যাখ্যা প্রচার হওয়ায় বিভ্রান্তি আরো বাড়ছে।
গবেষণা ও চিন্তার ঘাটতি : অনেক মাদরাসা শিক্ষার্থী কেবল পাঠ্যবই মুখস্থ করতে মনোযোগ দেয়; কিন্তু গবেষণা, বিশ্লেষণ ও চিন্তাশীলতার অভ্যাস তৈরি হয় না। ফলে নতুন সমস্যার সমাধান বা সমসাময়িক ইস্যুতে শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে তারা পিছিয়ে পড়ে।
ইসলামী অর্থনীতি, পরিবার আইন, পরিবেশ আইন ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক গবেষণার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়।
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় : পরিকল্পিতভাবে, সমন্বিত প্রচেষ্টায় কাজ করলে দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে আমাদের সম্মুখে উত্থাপিত এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব। কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কিছু করণীয় উল্লেখ করা হলো-
দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় করা : রাসূল সা:-এর সিরাত এবং সাহাবি-তাবেয়িদের জ্ঞানচর্চা থেকে আমরা ভারসাম্যের উদাহরণ দেখি। যুগে যুগে সব ইসলামী ব্যক্তিত্বই দ্বীন ও দুনিয়াবি জ্ঞানের সমন্বয় সাধন করেছেন। বর্তমানে আমাদেরকেও সেদিকে ফোকাস করতে হবে। আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে, একজন মাদরাসার শিক্ষার্থী আলেম হওয়ার পাশাপাশি যেন সমাজের নীতি-নির্ধারকের ভূমিকাও পালন করার সক্ষমতা অর্জন করে।
রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও বাজেট বৃদ্ধি : যেকোনো কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক সহায়তা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই দ্বীনি শিক্ষাকে সামগ্রিকভাবে প্রসারের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। সরকারি শিক্ষা খাতের বাজেটের একটি অংশ দ্বীনি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করতে হবে। নিয়মিতভাবে শিক্ষকদের জন্য ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা গেলেও এই পেশার মান অনেক বেড়ে যাবে। বিশেষ করে, প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নেও সরকারি অনুদান বাড়ানো জরুরি।
আলেমদের সামাজিক নেতৃত্ব ও গবেষণামূলক ভূমিকা : আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত একটি কথা আছে- ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত!’ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের এই সময়ে এসে এই লাইনটি মিথ্যা প্রমাণ করা এখন সময়ের দাবি। ইতোমধ্যেই অসংখ্য দেশে মোল্লা তথা আলেম সমাজ তাদের দৌড়ের সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাই আমাদেরও উচিত আলেম সমাজকে শুধু মসজিদের মিম্বারে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ সংস্কারে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা। বিশেষত ইসলামী ব্যাংকিং, পরিবার আইন, পরিবেশ সুরক্ষা ও মানবাধিকার- এসব বিষয়ে আলেমদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।
নারীদের দ্বীনি শিক্ষা প্রসার : অর্ধেকের বেশিসংখ্যক জনসংখ্যার এই বিশাল জনগোষ্ঠী ‘নারী’কে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কোনো সুযোগ নেই। রাসূল সা: এবং সাহাবি-তাবেয়িদের যুগেও নারীদেরকে ইলম অর্জনে বাধা দেয়া হয়নি। যার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ প্রখ্যাত মুহাদ্দিস উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা:। তাই ইলমে দ্বীন শিক্ষার এই সঙ্কট নিরসনে আমাদেরও উচিত নারীদের জন্য সহশিক্ষামুক্ত ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। আশানুরূপভাবে, বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নারীদের কুরআন-হাদিস শেখার এবং শেখানোর হার বেশ ভালোই বেড়েছে। তবে তা আরো বিস্তৃত করা দরকার।
লেখক : শিক্ষার্থী, মাস্টার্স বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।



