বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতৃত্ব দেবেন এই নতুন যাত্রায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন ও অর্থনৈতিক চাপে থাকা দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে প্রথম ১০০ দিনে সরকার কী করবে।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপির সরকার ঘিরে এখন নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনোত্তর বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য, আইনশৃঙ্খলা ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু দেশের স্বার্থে সবাইকে এক থাকতে হবে।’ একই সাথে তিনি সতর্ক করে দেন, কোনো ধরনের সহিংসতা বা অরাজকতা বরদাশত করা হবে না এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা, রাজনৈতিক মামলাগুলো পর্যালোচনা এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ জোরদার করা হবে। অর্থনীতিতে বাজার নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রণোদনার উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু, আইসিটি খাতে বড় আকারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে সংবিধান ও নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব, স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। একই সাথে বিএনপি তাদের ইশতেহারে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছে। এই সনদের আওতায় নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা, প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাস, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে বিকেন্দ্রীকরণ বাড়ানো এবং সংসদীয় ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কাঠামো প্রবর্তনের বিষয়টিও জুলাই সনদের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দলীয় নেতাদের মতে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জেলাপর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং দরিদ্রদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালুর কথাও নেতারা উল্লেখ করেছেন। পরিবেশ সুরক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ অবস্থান তুলে ধরে নেতারা বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া হবে, বিশেষ করে সীমান্ত হত্যা ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নেয়া হবে। একই সাথে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরো জোরদারের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। দলীয় নেতারা বলছেন, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণই হবে নতুন সরকারের লক্ষ্য।
সামগ্রিকভাবে বিএনপির প্রথম ১০০ দিনের রূপরেখায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জুলাই সনদের আলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভিত্তি গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সক্ষমতা, বিরোধীদের সাথে সংলাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রাখবে- এমন মন্তব্যও এসেছে দলীয় সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যে।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে এবং এখন দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সেই আস্থার প্রতিদান দিতে হবে। তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তরুণদের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু করার সময় এখন। তার মতে, যুবসমাজ বিএনপির প্রতি যে আস্থা রেখেছে, তা বাস্তব উন্নয়নের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।



