আশরাফুল ইসলাম
চলতি বছরে বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার দায় কাঠামোয়। রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, পাশাপাশি আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমেছে। এরই ফলে সর্বশেষ তিন মাসে, অর্থাৎ চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার দায় কমেছে ১৪৪ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা এই প্রবণতাকে দেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক ও আশাব্যঞ্জক হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত জুন শেষে সরকারি ও বেসরকারি মিলে বৈদেশিক মুদ্রার মোট দায় ছিল ১১৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, সেপ্টেম্বর শেষে তা কমে নেমেছে ১১২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। এতে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই দায় কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক তিন মাসে বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য মোট দায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে দায় কমার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ নিয়মিত পরিশোধ, স্বল্পমেয়াদি দায় কমানো এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর কারণে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, ঋণ পরিশোধ এবং ডলারের বিনিময় হার নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে প্রশমিত হচ্ছে। রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরী পোশাক শিল্পে অর্ডার বাড়া এবং প্রবাসী আয়ে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে লেনদেন বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বেড়েছে। এতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের চাপও কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা বৈদেশিক মুদ্রার দায় ব্যবস্থাপনায় স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছি। এতে হঠাৎ করে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট তৈরি হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে।’ তিনি জানান, দায় পুনর্বিন্যাস এবং সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাও কিছুটা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার দায় কমার একটি বড় সুবিধা হলো ভবিষ্যতে সুদ ও কিস্তি পরিশোধের চাপ লাঘব হওয়া। এর ফলে সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি আসবে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। একই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা তুলনামূলক সহজ হবে। তারা বলেন, ‘দায় কমা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে এটি যেন সাময়িক না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। রফতানি আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার খোঁজা জরুরি।’ তিনি আরো বলেন, রেমিট্যান্স আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে ধরে রাখতে প্রণোদনা ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।
অন্য দিকে, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণও এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসপণ্যের আমদানি সীমিত রাখা, এলসি খোলায় সতর্কতা এবং মূল্যস্ফীতিজনিত চাহিদা কমে আসায় ডলারের বহিঃপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য কিছুটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রার দায় কমার এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণের সময় তার ব্যবহার ও পরিশোধ সক্ষমতা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।



