জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের সময় সংগঠিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে দাখিল করা হতে পারে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে বলা হয়েছে।
এ দিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আজ রোববার দিন ধার্য রয়েছে। প্রসিকিউশনের দুই মাস সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০ এপ্রিলের মধ্যে শেখ হাসিনার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলারও ২০ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। এ দিকে এ মামলায় গ্রেফতার শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, ড. আব্দুর রাজ্জাক, দীপু মনিসহ ১৯ জনকে রোববার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে বলে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো কয়েক দিন সময় চাওয়া হতে পারে।
অন্য দিকে জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংগঠিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাসহ বিচারাধীন চারটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত শেষ বা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এসব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গৃহীত হওয়ার সাথে সাথেই আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে।
তদন্ত শেষ বা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে যে চারটি মামলার : গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের হওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা, সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনা, রাজধানীর চানখাঁরপুলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এবং রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা এক ব্যক্তির ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা।
এ দিকে ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার দিন রয়েছে এ দিন। দিন ধার্য থাকায় রোববার চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, ড. আব্দুর রাজ্জাক, কামরুল ইসলাম, মুহাম্মদ ফারুক খান, দীপু মনি, গোলাম দস্তগীর গাজী, শাজাহান খান, উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক সচিব মো: জাহাঙ্গীর আলম ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় এখন পর্যন্ত ৩৩৯টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং এই অভিযোগের ওপর ট্রাইব্যুনালে ২২টি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে। আর এসব মামলায় মোট ১৪১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ৫৪ জন আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। বাকি ৮৭ জন পলাতক রয়েছেন বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়েছে।
পলাতক আসামিদের গ্রেফতার : পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল থেকে ওয়ারেন্ট বের হওয়ার তথ্য আগেই আসামির কাছে চলে যাওয়ার মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। আর বিদেশে যারা পালিয়ে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ। এখানে কূটনৈতিক দু’টি ধাপেই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে প্রায় এক হাজার জনের। এ ছাড়া জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলনে সময় ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও ও ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এক হাজারের বেশি ভিডিও ক্লিপস সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোর পর্যালোচনা, ভেরিফিকেশন ও জিওলোকেশন যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়েছে : বিদেশে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে; যা বর্তমানে ইন্টারপোলের নিজস্ব পদ্ধতির মধ্যে আছে। জুলাই-আগস্ট গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওয়ারেন্টভূক্ত আসামি বিদেশে পলাতক এসব আসামীদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে পৃথক তিনটি ধাপে আবেদন করেছে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)।
শেখ হাসিনা ছাড়া যাদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করার জন্য আবেদন করা হয়েছে, তারা হলেন- সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আপনারা জানেন যে, প্রক্রিয়াটা হচ্ছে আমাদের এখান থেকে আদালতের আদেশ এবং আমাদের চিঠিসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। হোম অ্যাফেয়ার্সের আন্ডারে (অধীনে), অর্থাৎ ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের (আইজিপি) অফিসে আলাদা একটা সেকশন আছে। সেখান থেকে এটা ইন্টারপোলের কাছে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, আমরা রেড নোটিশের জন্য সব ডকুমেন্টস তৈরি করে আমাদের অফিস থেকে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের অফিসে পাঠিয়েছি। সেখান থেকে যথানিয়মে এটা ইন্টারপোলের কাছে যাবে।



