খোকনের বক্তব্যে এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি

আপিল বিভাগে তুলকালাম

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে এক নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা আদেশ এবং তা মওকুফের আবেদনকে কেন্দ্র করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নজিরবিহীন ও চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এক বিতর্কমূলক ও স্পর্শকাতর বক্তব্যের জেরে এজলাস ত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পুরো বেঞ্চ।

গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাসে এই তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই বিচারকাজ মুলতবি হয়ে যায় এবং এরপর সারা দিনে আপিল বিভাগে আর কোনো বেঞ্চ বসেনি।

ঘটনার সূত্রপাত সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে, আপিল বিভাগের ১ নম্বর কার্যতালিকায় থাকা একটি মামলার আদেশ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। সংক্ষুব্ধ পক্ষের দায়ের করা মামলাটির মূল পেছনের ইতিহাস ছিল ২০১৩ সালের একটি কাজী নিয়োগকে ঘিরে। একজন কাজীর পদপ্রার্থী একই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে পরপর পাঁচটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সুস্পষ্ট রুলস বা নিয়ম অনুযায়ী, পূর্বে কোনো মামলা ফাইল করা হলে এবং তা খারিজ বা রিজেক্ট হলে, পরবর্তী নতুন মামলা দায়েরের সময় আগের মামলার বিস্তারিত তথ্য ও আদেশ উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। একই সাথে নতুন মামলায় নতুন ‘কজ অফ অ্যাকশন’ বা কারণ দেখাতে হয়।

কিন্তু উক্ত মামলায় পূর্বের খারিজ হওয়া আদেশ গোপন রেখে আদালতের চোখ ফাঁকি দিয়ে বারবার রিট দায়ের করা হয়। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এটিকে সুপ্রিম কোর্টের সাথে মারাত্মক প্রতারণা (সিরিয়াস ফ্রড) এবং আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী নির্দেশনার চরম লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ মূল রিট আবেদনকারীকে পাঁচ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা; সর্বমোট ১০ লাখ টাকা জরিমান আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, জরিমানার এই অর্থ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে হবে।

সকালে যখন আপিল বিভাগ এই ঐতিহাসিক কড়া আদেশ প্রদান করছিলেন, তখন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এজলাসে উপস্থিত ছিলেন না। তবে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। আদেশ শুনে অ্যাটর্নি জেনারেলের পাশেই বসে থাকা সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী ও তার আইনজীবী স্বামী চরম বিপাকে পড়েন।

অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ওই নারী আইনজীবী তখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে বারবার বলছিলেন, ‘খোকন ভাই আমাকে কী বিপদে ফেলল! আমাকে কী বিপদে ফেলল!’ মূলত নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে এই মামলাগুলোতে মূল সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তা সত্ত্বেও আদেশের মুহূর্তে খোকন উপস্থিত না থাকলেও নারী আইনজীবী ও তার স্বামী আদালতের আদেশ মেনে নিয়েছিলেন এবং কোনো উচ্চবাচ্য করেননি।

ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর, বেলা ১২টা ৩৫ মিনিটের দিকে ১ নম্বর এজলাসে ঘটে মূল ঘটনা। সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এজলাসে উপস্থিত হয়ে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং উক্ত নারী আইনজীবীর পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা মওকুফের আরজি জানান।

প্রধান বিচারপতি তখন স্পষ্ট ভাষায় তাকে জানান যে, এটি চরম প্রতারণামূলক মামলা এবং আদালত সব কাগজপত্র দেখেশুনেই আদেশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এই আদেশ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু ব্যারিস্টার খোকন জরিমানা মাফ করার দাবিতে অনড় থেকে হুট করে বলে বসেন, ‘আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আপিল বিভাগে বিচারকাজ সেভাবে হচ্ছে না এবং আইনজীবীদের ইনকাম (আয়) অনেক কমে গেছে।’

ব্যারিস্টার খোকনের এই বিতর্কিত মন্তব্য শুনে প্রধান বিচারপতি শুরুতে বিষয়টিকে কিছুটা হালকাভাবে নিয়ে খোকনকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি সত্যি সত্যি এই কথাটি মিন করছেন কি না। কিন্তু মাহবুব উদ্দিন খোকন নিজের বক্তব্যে অটল থেকে আইনজীবীদের আর্থিক লোকসান ও মামলা জটের কথা পুনরায় বোঝানোর চেষ্টা করেন।

এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আপনি যে কথাটা বললেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার (কনটেম্পচুয়াস) শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।’ এ কথা বলেই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য মাননীয় বিচারপতিরা একযোগে এজলাস ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেন ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, ‘আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন এবং ৩টি বেঞ্চে মামলা শুনানি হতো। এখন মাত্র একটি বেঞ্চ থাকায় বিচারপ্রার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চেম্বার আদালতের স্থগিতাদেশ শুনানি করতেই বছর পার হয়ে যাচ্ছে। আইনজীবীদের কাজ ও আয় কমে গেছে। ১ নম্বর আইটেমের মামলায় একজন জুনিয়র নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেয়া অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। তাই বারের প্রতিনিধি হিসেবে আইনজীবীদের স্বার্থে আমি বিনয়ের সাথে প্রধান বিচারপতিকে এটি বিবেচনা করতে বলেছিলাম। উনি এত রাগ বা রিঅ্যাক্ট করবেন তা আমি আশা করিনি।’

ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তুলে ধরে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আমাদের পেশা পরিচালনার জায়গা এবং এই প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হলেন মাননীয় প্রধান বিচারপতি। আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে কাজের প্রয়োজনে অনেক সময় বাগি¦তণ্ডা বা বকাঝকার ঘটনা ঘটে, যা আমাদের পেশাগত সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু এর সৌন্দর্য হলো, সেই ভুল বোঝাবুঝি আদালতের সেই নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাইরে আসে না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল অভিযোগ করে বলেন, ‘মাহবুব উদ্দিন খোকন সাহেব সুপ্রিম কোর্টবারের সভাপতি, সাতবারের সাবেক সম্পাদক এবং একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। তার কাছে দায়িত্বশীল আচরণ কাম্য ছিল। যে নারী আইনজীবীর জরিমানা মওকুফের কথা তিনি বলছেন, ওই নারী আইনজীবী আদেশের পর নিজে তা মেনে নিয়েছিলেন এবং ঘটনা ঘটার সময় তিনি এজলাসে উপস্থিতও ছিলেন না। খোকন সাহেব সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিচার বিভাগ ও প্রধান বিচারপতিকে আক্রমণ করে এসব কথা বলেছেন।’

তিনি আরো বলেন, সংক্ষুব্ধ হলে আপিল বিভাগের এই আদেশের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ‘রিভিউ’ আবেদন করার স্পষ্ট সুযোগ ছিল। তা না করে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রধানকে উদ্দেশ্য করে ‘ইনকাম কমে গেছে’ বলে অসম্মানজনক মন্তব্য করা সম্পূর্ণ আদালত অবমাননাকর। ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য পুরো আইনজীবী সমাজকে জিম্মি করা বন্ধ হওয়া উচিত।