গণ-অভ্যুত্থানের পর ‘কোমায়’ চলে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কিছুটা উন্নতি হলেও সক্রিয়তায় ফিরতে পারেনি। ফলে একের পর বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধমূলক কর্মককাণ্ড। রাজনৈতিক বিরোধ, আধিপত্যের লড়াই, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দখল, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, চুরি, দিনদুপুরে ছিনতাইসহ নানা কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে মানুষ।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার না করলেও মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা বলছেন, গাছের মূল শক্ত হলে তার ডালপালাও শক্ত হয়। তাদের দাবি, নানা কারণে পুলিশের ওপরমহল এখনো শক্ত হতে পারেনি। যার কারণে মাঠপর্যায়ের সদস্যরা পূর্ণশক্তি নিয়ে কাজ করতে পারছে না। তাদের অভিযোগ, মব সৃষ্টি করে পুলিশের ওপর হামলা। বদলি পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ, আসামি ধরলে নানামুখী চাপসহ বিভিন্ন কারণে এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি দেশের সবচেয়ে বড় এই বাহিনীর সদস্যরা। এ ছাড়া বর্তমানে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব। আসন্ন নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় আসবে সেটা ভেবে ওই দলসমর্থিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে নমনীয় আচারণ করছে কোনো কোনো পুলিশ সদস্য। যাতে সরকার গঠনের পর তারা পুলিশের ওই কর্মকর্তার ওপর প্রতিশোধ পরায়ন না হন। এতে করে ক্রমান্বয়ে চেইন অব কমান্ডের দুর্বলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ দিকে কী কী কারণে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে পুলিশ সদর দফতর। বিভিন্ন ইউনিট, মেট্রোপলিটন, রেঞ্জ ও জেলা পুলিশের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে। নির্বাচনী নিরাপত্তার আড়ালে অন্য অপরাধ যাতে বাড়তে না পারে সেদিকেও নেয়া হচ্ছে বিশেষ নজরদারি। মাঠপর্যায়ের ফোর্সদের উজ্জীবিত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এসপিদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে। অফিসিয়াল কাজ কমিয়ে অধিক পরিমাণ ফোর্স মাঠে মোতায়েন রাখতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। অপরাধ-প্রবণ এলাকায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য বা ইউনিটের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও বার্তা পাঠানো হয়েছে। চব্বিশের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর তীব্র গণরোষে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পুরো পুলিশবাহিনী। আত্মগোপনে চলে যায় বিগত সরকারের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত পুলিশ সদস্যরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার কারণে বেড়ে যায় চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যা, মব, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর সে ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নতুন করে সাজিয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি আনার চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু সেই কার্যক্রম সহজভাবে হয়নি। কোন অপরাধ ঠেকাতে গেলেই মব সৃষ্টি করে হামলা চালানোর একাধিক ঘটনা ঘটে। থানার অফিসারকে বদলি করতে বা বদলি ঠেকাতেও শুরু হয় বহিরাগতদের অযাচিত হস্তক্ষেপ। অপরাধীকে ধরে রাখা না রাখার বিষয়েও আসতে থাকে নানামুখী চাপ। এসব চাপ প্রতিহত করে কাজ করার ক্ষমতা পুলিশের রয়েছে। কিন্তু ওপরের নির্দেশ শক্ত অবস্থানে থাকা যাবে না। আর এতেই মার খেতে হচ্ছে এই বিশাল বাহিনীর সদস্যদের। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরছে না, পুলিশ নিজেও স্বস্তি পাচ্ছে না। ডিউটিতে গেলেই পুলিশকে ভাবতে হচ্ছে এই কাজ করলে কোনো শাস্তির সম্মুখিন হবেন কি না অথবা তিনি নিরাপদ থাকবেন কি না।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা জানান, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই পুলিশের কাজ। কিন্তু এখনো তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকতে হচ্ছে। যার কারণে অনেক পুলিশ সদস্য গা ছাড়া ভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তাও পুলিশকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সামনে নির্বাচনে কোন দল ক্ষমতায় আসছে তা নিশ্চিত নয়। যার কারণে অপরাধী যদি বিশেষ কোনো দলের হয়ে থাকে তখন কোনো পুলিশ দায়িত্ব নিয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায় না। কারণ ক্ষমতায় আসার পর ওই ব্যক্তি যদি পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে কি হবে। এ দিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে হওয়ায় বাড়ছে অপরাধ। ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার পরের দিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এর পর থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে একের পর এক টার্গেট কিলিং ও গুলির ঘটনা লেগেই আছে।
গত শনিবার গভীর রাতে রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে সাদিয়া রহমান মিম (২৭) নামে এক নারীর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১২ জানুয়ারি রাতে পশ্চিম রাজাবাজারে গ্রিল কেটে ঘরে ঢুকে জামায়াতে ইসলামীর নেতা আনোয়ার উল্লাহকে (৬৫) হত্যা করা হয়। ৭ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ জানুয়ারি দক্ষিণ বনশ্রীতে ফাতেমা আক্তার নিলি নামে দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। একই দিন ভোরে ভাটারা থানার ভেতর থেকে পুলিশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল চুরি হয়। ১৬ জানুয়ারি উত্তরায় নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করে তার কাছ থেকে শটগান ছিনতাই করা হয়। ৭ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইলে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর ৮০ লাখ টাকা ছিনতাই হয়।
১৩ জানুয়ারি উত্তর বাড্ডায় আবাসন কোম্পানির কার্যালয় লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। ৪ জানুয়ারি মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা বাজারের ‘নিউ রানা জুয়েলার্স’ নামে দোকান থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণ এবং ৬০০ ভরি রুপা চুরি হয়। ১৭ নভেম্বর মিরপুরে দোকানে ঢুকে পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে (৪৭) গুলি করে হত্যা করা হয়। ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে শীর্ষসন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫) ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতা, মব সহিংসতা এবং হঠাৎ সংঘটিত ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তবুও সীমিত জনবল ও সম্পদের মধ্যেই পুলিশ নিয়মিত অভিযান, তদন্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে। পরিস্থিতি আরো উন্নত করতে জনসম্পৃক্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হচ্ছে।



