নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই শেষ সময়ের দিকে এগোচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করে বলেছে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ সৃষ্টি হলে সেটি হবে এ সরকারের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন ও বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনকে সামনে রেখে এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সংস্থাটির সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিন। শেখ হাসিনার পতন থেকে শুরু করে গত দেড় বছরে রাজনৈতিক রূপান্তর, সংস্কার উদ্যোগ, দলীয় পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র তিনি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, এবারের নির্বাচন হবে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে দু’টি বড় জোটে-একটি বিএনপির নেতৃত্বে, অন্যটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে। তবে উভয় পক্ষই বহুমাত্রিক সঙ্কট ও সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।
প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা : ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যাপক। কিন্তু সেই তুলনায় অগ্রগতি সীমিত। কিছু সংস্কার উদ্যোগ মাঝপথে থেমে গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উল্লেখযোগ্য উন্নতি পায়নি।
বিশ্লেষণে বলা হয়, নতুন সরকারকে একসাথে রাজনৈতিক সমঝোতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
‘প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন’?
টোমাস কিন লিখেছেন, কোটি কোটি ভোটারের জন্য এবারের নির্বাচন হতে পারে ‘জীবনের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ।’ কারণ শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং দুর্নীতির অভিযোগ একত্রে সরকারের জনপ্রিয়তা ক্ষয় করে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান হাসিনা সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।
নিবন্ধে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সহিংস দমন-পীড়ন, প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যু, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, হাসিনার ভারতে পলায়ন এবং ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ, সবকিছু ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্কার উদ্যোগ ও ‘জুলাই সনদ’ : অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন, সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, বিচার বিভাগের পুনর্বিন্যাসসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে ছয়টি কমিশন গঠন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ‘জুলাই সনদে’ সই করে।
এই সনদে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি সংস্কার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, সরকার প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব দেখিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে এবং কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত সহনশীলতা দেখিয়েছে।
তবুও আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে হলেও একটি ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরিতে সরকার সফল হয়েছে বলে মনে করে ক্রাইসিস গ্রুপ।
আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত, লড়াই দুই জোটে : নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটির বিপুল সমর্থক কার্যত ভোটের বাইরে। এতে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে গেছে।
বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বড় দল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অভিযোগে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
অন্য দিকে জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। ছাত্রসংগঠনের সক্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাব এবং ‘শৃঙ্খলাপূর্ণ ও তুলনামূলক সৎ’ ভাবমূর্তি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। এনসিপির সাথে জোট করে দলটি আরো শক্ত অবস্থানে গেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা : সবচেয়ে বড় ঝুঁকি
নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ক্রাইসিস গ্রুপ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ বেড়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও সহিংসতার অন্যতম উৎস। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে। ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করেছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে অন্তত ১৬ জন রাজনীতিবিদের নিহত হওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের দুর্বলতা ও মব সহিংসতার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে।
‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ কোথায় : টোমাস কিন সতর্ক করে লিখেছেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ দেখা দিলে তা দ্রুত রাজনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দেয়া ইউনূস সরকারের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে।’
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা অনেকটাই সেনাবাহিনী ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নাজুক সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে। ফলাফল নিয়ে সঙ্ঘাত হলে সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পরবর্তী সরকারের সামনে করণীয় : নতুন সরকারের জন্য সামনে রয়েছে মন্থর অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক ভারসাম্য, রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং কট্টরপন্থার উত্থান, এমন বহুস্তরীয় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও সুশাসনের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অস্থিরতা বাড়তে পারে। একই সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটিকেও ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর’ বলে উল্লেখ করেছে ক্রাইসিস গ্রুপ। দলটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাদ রাখা বাস্তবসম্মত নয়, তবে তাদের ফিরে আসার শর্ত নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ক্রাইসিস গ্রুপের মূল্যায়ন-বাংলাদেশের সামনে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত নির্বাচন অপেক্ষা করছে। শান্তিপূর্ণ ভোট ও ফলাফল গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে না পারলে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় মুহূর্তেই বড় রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হতে পারে।



