টি-২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেট

ভারতে দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত বিসিবির

Printed Edition

ক্রীড়া প্রতিবেদক

আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে স্থানান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় হতে যাওয়া আইসিসি টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনার জন্য বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের এক জরুরি সভা গতকাল বিকেলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বোর্ড গত ২৪ ঘণ্টার বাস্তবতা বিবেচনা করে পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে। ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের অংশগ্রহণ সম্পর্কিত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতি এবং ভারতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় দল বিশ^কাপ খেলতে ভারতে ভ্রমণ করবে না। গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি।

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এ আসরে বাংলাদেশের খেলাগুলো হবে কলকাতা ও মুম্বাইতে। পাকিস্তানের আপত্তির কারণে তাদের সব খেলা অনুষ্ঠিত হবে শ্রীলঙ্কায়। ভারত ও পাকিস্তান একই গ্রুপে রয়েছে। বাংলাদেশের গ্রুপে রয়েছে ইংল্যান্ড, ইতালি, নেপাল ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

বিসিবির একজন পরিচালক জানান, ‘বেলা ১টায় ১৭ জন পরিচালক ভার্চুয়াল বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইসিসিকে একটি মেইল দেয়ার। যেহেতু তারা আমাদের একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তা দিতে পারছে না, গোটা দলের নিরাপত্তা কিভাবে দেবে? অনেকেই খেলা দেখতে যাবে, সাংবাদিকরা যাবেন। সবার কথা চিন্তা করেই ভারতে খেলতে না যাওয়ার এমন সিদ্ধান্ত।’

এই সিদ্ধান্তের আলোকে বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) ইভেন্ট কর্তৃপক্ষ হিসেবে, বাংলাদেশের সব ম্যাচ ভারতের বাইরে অন্য কোনো ভেনুতে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেছে। বোর্ড বিশ্বাস করে, বাংলাদেশী খেলোয়াড়, দলের কর্মকর্তা, বোর্ড সদস্য এবং অংশীদারদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতের জন্য এবং দলটি যাতে নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য এই ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিসিবি পরিস্থিতি সম্পর্কে আইসিসির প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

বিসিবির মূল উদ্বেগ; নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপড়েন, ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের কিছু ঘটনা এবং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক শীতলতা বোর্ডকে সতর্ক করেছে। বিসিবির দাবি, খেলোয়াড়দের মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে চাপের মধ্যেই খেলতে হয় ক্রিকেটারদের, সেখানে নিরাপত্তা শঙ্কা বা রাজনৈতিক উত্তেজনা পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। এ যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আইসিসি আয়োজিত বিশ্বকাপ মানেই বৈশ্বিক আসর, যেখানে রাজনীতি নয়, ক্রিকেটই মুখ্য হওয়ার কথা। অতীতে নানা দেশ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অজুহাতে সফর বাতিল বা ভেনু পরিবর্তনের দাবি তুলেছে ঠিকই, কিন্তু আইসিসি সাধারণত স্বাগতিক দেশের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপরই আস্থা রাখে। ভারত বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী বোর্ড এবং বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা প্রশ্নাতীত। এখন বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে, আইসিসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিরই দেখার অপেক্ষায় বিসিবি এবং পুরো জাতি।

বিসিবির সিদ্ধান্ত আবেগনির্ভর নয়, বরং সতর্কতামূলক। বিষয়টি নির্ভর করবে আইসিসির প্রতিক্রিয়া, স্বাগতিকদের দেয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনার ওপর। ক্রিকেট যেন রাজনীতির বলি না হয়- এটাই প্রত্যাশা।

সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা : বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আসিফ নজরুল লেখেন, ‘বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বিসিসিআইয়ের উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতির প্রেক্ষিতে গৃহীত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।’

ভারতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) নতি স্বীকার করে গতকাল আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দেয়। এতে মোস্তাফিজকে দল থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে কেকেআর। এরপরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দেশের ক্রিকেট ভক্তরা। এর আগে গত শনিবার রাতে আসিফ নজরুল ফেসবুকে লেখেন, ‘ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হিসেবে আমি ক্রিকেট বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছি পুরো বিষয়টি লিখিতভাবে আইসিসিকে জানাতে। চুক্তির আওতায় থেকেও যদি কোনো বাংলাদেশী ক্রিকেটার ভারতে খেলতে না পারেন, তাহলে জাতীয় দল বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে গেলে নিরাপদ বোধ করবে না। তাই আমি বোর্ডকে অনুরোধ করতে বলেছি, বাংলাদেশের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেন শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হয়।’

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের বক্তব্য : ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বিসিসিআইয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বকাপের মতো বিশাল একটি টুর্নামেন্টের সূচি এভাবে হঠাৎ করে বদলে ফেলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা একেবারেই লজিস্টিক দুঃস্বপ্ন। প্রতিটি ম্যাচের সাথে প্রতিপক্ষ দলগুলোর বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং ও সম্প্রচার স্বত্বসহ অসংখ্য কারিগরি ও প্রশাসনিক বিষয় জড়িত। প্রতিদিন তিনটি করে ম্যাচ থাকায় একটি ম্যাচ স্থানান্তর করা মানে পুরো টুর্নামেন্টের সূচি ও ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়া, যা এই মুহূর্তে সামাল দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদিও রাজনৈতিক কারণে পাকিস্তান তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলবে। এ বিষয়ে বিসিসিআইয়ের যুক্তি, ‘পাকিস্তানের বিষয়টি আগে থেকেই নির্ধারিত, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে সম্ভব নয়।’