আল-আরাবিয়া
সিরীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল শনিবার আলেপ্পো শহরের বাইরে দেইর হাফের শহর তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এর এক দিন আগে কুর্দি বাহিনী সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর ওই এলাকা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া বিবৃতিতে সেনারা জানায়, তারা দেইর হাফের শহরে পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এএফপির এক প্রতিবেদকও শহরে সেনাদের মোতায়েন হতে দেখেছেন।
তবে সিরীয় ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) অভিযোগ করেছে, তাদের যোদ্ধারা সরে যাওয়ার আগেই সেনারা মাসকানাহ ও দেইর হাফের শহরে প্রবেশ করেছে। তারা বলছে, সরকার চুক্তির শর্ত মানেনি। এসডিএফ চুক্তির পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে। দুই শহর দখলের পর সিরীয় সেনারা ঘোষণা দেয়, তারা উত্তরাঞ্চলের সুফিয়ান ও থাওরাহ তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কুর্দি যোদ্ধারা চুক্তির আওতায় বহু শহর ও গ্রাম থেকে সরে যাচ্ছে, যাতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানো যায়। তবে কুর্দি বাহিনী এখনো সিরিয়ার পূর্বাঞ্চল দেইর আল-জোর প্রদেশের বড় তেলক্ষেত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। সিরীয় সরকার বলছে, এসব ক্ষেত্র কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকতে হবে।
গত সপ্তাহে আলেপ্পো শহর থেকে কুর্দিদের সরিয়ে দেয়ার পর সেনারা দেইর হাফেরের কাছে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে এবং এসডিএফকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়। শুক্রবার কুর্দি নেতা মাজলুম আবদি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত এসডিএফ শনিবার সকালে ইউফ্রেটিসের পূর্বাঞ্চলে পুনঃমোতায়েনের জন্য সরে যাবে। তিনি জানান, বন্ধুপ্রতিম দেশ ও মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বানেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিরীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আবদির ঘোষণাকে স্বাগত জানায় এবং জানায়, এসডিএফ সরে যাওয়ার পর সেনারা ওই এলাকায় মোতায়েন হবে। সিরীয় সেনারা সাম্প্রতিক দিনে দেইর হাফের এলাকার সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বলেছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত চার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়েছে।
শুক্রবার সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এক অধ্যাদেশে কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর সংখ্যালঘুদের প্রতি সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দীর্ঘ দিনের নেতা বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সিরীয় সরকার দেশজুড়ে কর্তৃত্ব বিস্তারের চেষ্টা করছে। গত মার্চে কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। তবে আল-শারার ঘোষণাটি ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কুর্দিদের জাতীয় অধিকার স্বীকৃতি দিলো। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কুর্দিরা সিরিয়ার অপরিহার্য ও আদি অংশ। তারা অতীতে বহু দশক বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এখন থেকে কুর্দি ভাষা জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হবে এবং সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় সরকারি স্কুলে পড়ানো যাবে। কুর্দি বাহিনী এখনো সিরিয়ার উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। গত এক দশকে গৃহযুদ্ধ ও আইএসবিরোধী লড়াইয়ে তারা এসব এলাকা দখল করে।
কুর্দিদের নাগরিকত্ব ও ভাষার স্বীকৃতি দিলো আল শারার সরকার
এদিকে আলজাজিরা জানায়, সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা কুর্দিদের মূলধারায় ফিরিয়ে নিতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। শুক্রবার এক বিশেষ অধ্যাদেশে তিনি কুর্দিদের সিরিয়ার ‘অপরিহার্য ও আদি’ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর মাধ্যমে আরবি ভাষার পাশাপাশি কুর্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং এখন থেকে স্কুলে কুর্দি ভাষা পড়ানো যাবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৬২ সালে হাসাকা প্রদেশে বিতর্কিত আদমশুমারির ফলে কয়েক লাখ কুর্দির নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার আইন বাতিল করা হয়েছে। ফলে সিরিয়ায় বসবাসরত সব রাষ্ট্রহীন কুর্দি এখন থেকে পূর্ণ নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার ফিরে পাবেন। এই সিদ্ধান্তকে সিরিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ঘোচানোর বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই অধ্যাদেশের প্রধান দিকগুলো হলো কুর্দি ভাষা এখন থেকে সিরিয়ার সরকারি জাতীয় ভাষা। কুর্দি অধ্যুষিত এলাকার সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে এই ভাষা বাধ্যতামূলক বা ঐচ্ছিক পাঠ্য হিসেবে রাখা হবে। কুর্দিদের বসন্ত উৎসব ও নববর্ষের (নওরোজ-২১ মার্চ) দিন সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় জাতিগত বা ভাষাগত বৈষম্য কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিগত বিভেদ ছড়ালে দণ্ডবিধির আওতায় কঠোর শাস্তির বিধানও রাখা হয়েছে। আহমেদ আল-শারার এ ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো, যখন উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পো শহরে কুর্দি যোদ্ধা এবং সিরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছে।



