রফতানিমুখী শিল্পে সহায়তার নামে বছরের পর বছর বন্ড সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। তবে সেই সুবিধার আড়ালে ভয়াবহ রাজস্ব ক্ষতির চিত্র উঠে আসছে। শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগকে অপব্যবহার করে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ করছে। আবার কেউ কেউ কাগজে-কলমে রফতানি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ হিসাব ও সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্যানুযায়ী, শুধু বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণেই প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্র যার বড় অংশই এখনো অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গার্মেন্টসের বন্ড সুবিধায় আনা সুতা বিক্রি হচ্ছে খোলা বাজারে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার ও নরসিংদীর মাধবদী, বাবুরহাট, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ দেশের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে স্থায়ী সুতা বিক্রির মার্কেট। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর সুতার চাহিদা কমায় কারখানার গুদামে বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত সুতা জমেছে। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টিরও বেশি মিল। বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে শুধু শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, সরকারও হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এরপরও কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি সরকার।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেশের স্বার্থবিরোধী একটি চক্র বন্ড সুবিধার সুতা-কাপড় কালোবাজারে বিক্রি করছে। সাথে যুক্ত হয়েছে কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অংশ। যারা অন্যের বন্ড লাইসেন্সে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে চুক্তি করে এই চোরাকারবারি চালাচ্ছে। এর ফলে শুধু দেশের সম্ভাবনাময় টেক্সটাইল বা বস্ত্র খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। শুধু বন্ড সুবিধার সুতা-কাপড় আমদানি করেই শূন্য থেকে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন অনেকে। যাদের মধ্যে কেউ কেউ একসময় ছিলেন হকার, সেলসম্যান বা প্রবাসী শ্রমিক।
রাজধানীর ইসলামপুরে চোরাই কাপড়ের বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকাশ্যে দিনের পর দিন প্রশাসনের নাকের ডগায় এত বড় অপরাধ সংঘটিত হলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চোখ-কান বন্ধ করে বসে আছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে দেশের টেক্সটাইল খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তারা বলছেন, বন্ড সুবিধার সুতা বিক্রি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার ও নরসিংদীর মাধবদী, বাবুরহাট, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচিসহ দেশের আনাচে-কানাচে। বন্ড কমিশনারেটগুলো মাঝে মধ্যে লোকদেখানো দু-একটি অভিযান (প্রিভেন্টিভ) করলেও পর্দার আড়ালে চোরাকারবারিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) তথ্যে দেখা যায়, প্রাইমারি টেক্সটাইল সেক্টরের স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং-প্রিন্টিং-ফিনিশিং মিলের সংখ্যা এক হাজার ৮৬৯টি। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। জিডিপিতে টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের অবদান ২০ শতাংশেরও বেশি। বর্তমানে বিটিএমএর মিলগুলো রফতানিমুখী তৈরী পোশাক শিল্পের নিট ও ওভেন ফ্যাব্রিকের প্রয়োজনীয় সুতার চাহিদা যথাক্রমে প্রায় শতভাগ ও ৬০ শতাংশ পূরণ করছে। অথচ বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে ইতোমধ্যে ৫০টিরও বেশি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় টেক্সটাইল মিল মালিকরা বলছেন, বন্ড সুবিধায় বানের পানির মতো সুতা আমদানি হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণায় নি¤œ কাউন্টের সুতার পরিবর্তে উচ্চ কাউন্টের সুতা অবৈধভাবে আমদানি করা হচ্ছে। বাস্তবে মিলের অস্তিত্ব না থাকলেও কাপড় আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় স্পিনিং ও উইভিং মিলের সুতা ও কাপড় অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় শিল্পকে রক্ষার্থে অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তথা বন্ড কমিশনারেটের সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা উচিত। এ কমিটির কাজ হবে বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের ওয়্যারহাউজ আকস্মিক পরিদর্শন করা। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে কাস্টমস হাউজগুলোতে এলসিতে উল্লিখিত পণ্যের সাথে আমদানীকৃত পণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য অটোমেটেড মেশিন স্থাপন করা উচিত।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের বস্ত্র খাত ভীষণ দুঃসময় পার করছে। গত এক বছর ধরে সরকারের কাছে বারবার সহযোগিতা চেয়েছি, কোনো সহযোগিতা পাইনি। সর্বশেষ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করলেও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় এনবিআর কোনো আদেশ জারি করছে না।
তিনি বলেন, এদিকে প্রতিযোগী সক্ষমতায় টিকতে না পেরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মিল বন্ধ হচ্ছে। সরকার যদি টেক্সটাইল শিল্পের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরা মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। কারণ কারখানা চালিয়ে লোকসান দেয়ার সক্ষমতা কোনো মিল মালিকের নেই। ব্যাংকঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা থাকলে অনেক মালিক মাথায় টেনশন নিয়ে এই ব্যবসায় আর থাকতে চায় না। সরকারের ভুল নীতির খেসারত দিচ্ছে বস্ত্র খাত দাবি করে রাসেল বলেন, ’৮০ দশকে সুতার অপচয় ছিল ১৫ শতাংশ। ধাপে ধাপে বাড়িয়ে সেটা ৩২ শতাংশে নেয়া হয়েছে। অথচ অত্যাধুনিক মেশিনের কারণে অপচয় হ্রাস পাওয়ার কথা। এই সুতা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু তুলা আমদানিতে শুল্ক বসানো হয়েছে, আবার ফিনিশড প্রোডাক্ট সুতায় শুল্ক নেই। টেক্সটাইল শিল্পের করপোরেট কর হারও বেশি। তার ওপর টার্নওভার কর ও ভ্যাট পরিশোধের চাপ রয়েছে বলে তিনি জানান।
বাদশা মিয়া টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদশা মিয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, গত ৪৬ বছর ধরে বন্ড সুবিধা চালু। আর কত দিন এটা চলবে। বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের কারণে ব্যাকওয়ার্ড শিল্প দাঁড়াতে পারছে না। এই সুবিধা বহাল রেখে বিদ্যমান ব্যাকওয়ার্ড শিল্পকে ধ্বংসের পরিকল্পনা চলছে। গার্মেন্টস মালিকরা এই ষড়যন্ত্রের পরিণতি আঁচ করতে পারছেন না। ভারত এখন কম দামে সুতা ডাম্পিং করছে। দেশের স্পিনিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ভারত একচেটিয়াভাবে সুতার দাম বাড়াবে, যেমনটা করেছিল করোনার সময় তুলা রফতানি বন্ধ করে দিয়ে। তিনি আরো বলেন, নীতি গ্রহণে উদাসীনতা দেখে মনে হচ্ছে সরকার দেশে মূল্য সংযোজনকারী শিল্প চায় না, শুধুমাত্র মজুরির (কাটিং-মেকিং) ব্যবসা করতে চায়। বন্ড সুবিধায় অবাধ আমদানি বহাল রেখে তাই মনে হচ্ছে।
বিটিএমএ-এর সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের পোশাক খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
প্রথম ধাপে বন্ড সুবিধার সুতা ও ভারতীয় আগ্রাসনে টেক্সটাইল মিলগুলো বন্ধ হবে। যখন এই ধাপ শেষ হবে, তখন ভারত সুতা দেয়া বন্ধ করে দিয়ে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতকে অকেজো করে দেবে। এর সাথে যুক্ত হবে মার্কিন পাল্টা শুল্ক ও জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তির জন্য মূল্য সংযোজনের চাপ। স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়াতে না পারলে এক সময় আমেরিকা ও ইউরোপ বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা তুলে নিলে তৈরী পোশাক খাত প্রতিযোগী সক্ষমতা হারিয়ে বিশ্ববাজার থেকে ছিটকে পড়বে বলে তিনি মনে করেন।



