নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতের সানডে গার্ডিয়ানের এডিটর জয়িতা বসুর সাথে এক পডকাস্টে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি বলেছেন, বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলন ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো বিদ্রোহ ছিল না। বিশ্বকে যেভাবে দেখানো হয়েছে এটা গণ-অভ্যুত্থান, আসলে তা নয়। বীণা বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনকে রেজিম চেঞ্জ অপারেশন হিসেবে অভিহিত করেন। বীণা দাবি করেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপস্টেট মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
জুলাই সনদ সম্পর্কে বীণা সিক্রি বলেন, এ সনদে সংস্কার হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার অবশিষ্ট রাখা হয়নি সংস্কারে। বিএনপি সংস্কারের সব ইস্যুতে সম্মত নয় বলে নির্বাচনী প্রচারণায় না ভোটের পক্ষে প্রথমে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান, জামায়াতে ইসলামী ও ডিপ স্টেটের চাপে বিএনপি শেষ পর্যন্ত হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দিয়েছে। ইউনূস এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে অজনপ্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। তার পেছনে আদৌ কোনো জনসমর্থন নাই।
বীণা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী তা হয়েছে, মাস্টারমাইন্ড হিসেবে মাহফুজ আলমকে পরিচয় করিয়ে দেন যিনি হিজবুত তাহরিরের সদস্য ছিলেন। হিজবুত তাহরিরকে ইসলামিক সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পরে মাহফুজ আলম উপদেষ্টা হন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেই এ রেজিম চেঞ্জ অপারেশন করা হয়। এ ধরনের অপারেশনের সাথে পাকিস্তান জড়িত এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ডিপস্টেট ও পশ্চিমা শক্তির সাথে যোগাযোগের সূত্র রেখেই বাংলাদেশে এ অপারেশন করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে পাকিস্তান সরাসরি এ কাজে জড়িত ছিল। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।
বীণা বলেন, তারেক রহমান রাজনীতিবিদ নন। তার মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন ‘হিউজলি ক্যারিশমেটিক’ লিডার। রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল খালেদার। তার মৃত্যুতে তাকে শেষবারের মতো দেখতে মাইলের পর মাইল বাংলাদেশের মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। তারেক তা নন। ‘ব্যাকরুম বয়’ হিসেবে হাওয়া ভবন পরিচালনা করতেন। যেটা প্রধানমন্ত্রীর ক্লোন হিসেবে কাজ করেছে। এখন গভীরভাবে পাকিস্তান প্রভাবিত। যখন আমি বাংলাদেশে হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করতাম তখন আইএসআইর প্রভাব এতই শক্তিশালী ছিল যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার লেভেলের নিচে কোনো পদোন্নতির প্রস্তাব প্রথমে পাকিস্তান হাইকমিশনে যেত তারপর তা আর্মি হেডকোয়ার্টারে যেত। গত সতের বছর লন্ডনে তারেক রহমানের চারপাশে আইএসআই কর্মকর্তারা ঘুরঘুর করত। তার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এর ক্লাসিক এক্সাম্পল হচ্ছে গণভোটে ‘না’ থেকে এখন তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থন চাচ্ছেন। কারণ পাকিস্তান ও জামায়াতে ইসলামী হ্যাঁ ভোট চাচ্ছে। তাই তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। এটা নেতিবাচক আলোর নির্দেশনা দিচ্ছে।
সেনাবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে বীণা বলেন, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ান ইলেভেনের সময় সেনাবাহিনী খুবই ভালো ভূমিকা রেখেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করেছে। তারা ডিজিটাল আইডি কার্ড নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু এখন সেনাবাহিনীর ভূমিকা খুবই হতাশাজনক। কারণ সেনাবাহিনী সমর্থন সরিয়ে নেয়ায় হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে সরে আসতে হয়েছে। সেনাবাহিনীর সাথে হাসিনা কিভাবে পরিস্থিতি শান্ত করা যায় আলোচনা করছিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের ঢাকায় আসতে দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি হাসিনার জীবনের ওপর হুমকি সৃষ্টি করে।
বীণা বলেন বর্তমানে জামায়াত ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাড়ছে। নিহতের ঘটনা ঘটছে। কে ভোট দিতে যাবে এটা এখন বড় প্রশ্ন। কারণ আওয়ামী লীগ, হাসিনা ও জয় জনগণের প্রতি নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে। সংখ্যালঘুরা ভোট দিতে না গেলে তাদের পরিবারকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে জামায়াত। ৫ আগস্টের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। কৃষক, দোকানদার, শিল্পকারখানার মালিক, চিকিৎসক কেউ এ ধরনের চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পায়নি। তারা খুবই বিরক্ত। সংখ্যালঘুরা বলছে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি মূলত বিএনপির নেতাকর্মীরাই করছে। ’৭১-এর পর বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস ঘটলেও সারা বিশ্ব নিশ্চুপ। নির্বাচন, মিডিয়া নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। জার্মানি বলছে ইনক্লুসিভ নির্বাচন মানে জনগণের অংশগ্রহণ। বিশ্বকে বাংলাদেশ পরিস্থিতি বিশ্বাস করানো অসাধ্য হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, ইউনূস একের পর এক চুক্তি করে গেছেন। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সরকার যত চুক্তি করেছে তার চেয়ে বেশি চুক্তি করেছেন ইউনূস। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের শুল্ক চুক্তির বছরের বেশি হয়ে গেলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। কক্সবাজারের দীর্ঘ সৈকতে মনোজাইট বালুসহ খনিজ সম্পদকে তুলে দেয়া হচ্ছে উল্লেখযোগ্য একটি পশ্চিমা কোম্পানিকে। সেন্টমার্টিনে যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে মনোজাইট স্যান্ড প্রসেসিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করার জন্যে। বঙ্গোপসাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে দুই থেকে তিনটি ব্লক আমেরিকান কোম্পানিকে দেয়া হচ্ছে। চীন ড্রোন ফ্যাক্টরি করছে বাংলাদেশে। লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটির উন্নয়ন করছে পাকিস্তান। সাত শ’ একর জায়গায় ৭০টি জঙ্গি বিমান রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তহবিল দিচ্ছে চীন। এগুলো সত্যিই ভারতের নিরাপত্তার জন্যে হুমকিস্বরূপ।
এমন অবস্থায় ভারতের অবস্থান কী হবে জানতে চাইলে বীণা বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পৌঁছানো কোনো সমস্যা নয়। খালেদার শাসনামলে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সব রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক রেখেছি। অতীতের দিকে নজর রাখলে তারেকের ভারত সম্পর্কে কোনো আগ্রহ আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনের পর কোন ধরনের সরকার গঠন হবে বাংলাদেশে তার ওপর নির্ভর করছে অনেক বিষয়। যদিও জামায়াত বলছে ভারতের সাথে সৌহার্দমূলক সম্পর্ক রাখবে কিন্তু নারীর অধিকার নিয়ে দলটির অবস্থান আমরা দেখছি। জামায়াতের আমিরের টুইট অ্যাকাউন্টে নারী সম্পর্কে মন্তব্য খুবই হতাশাজনক। নারীরা ঘর থেকে বের হতে না পারলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে বলা যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমিরের এমন মন্তব্য নিয়ে মিছিল হয়েছে মিডিয়া তা লুকিয়েছে। বাংলাদেশের টেকসই অবস্থান নির্ভর করছে বহুত্ববাদী সমাজের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র বলছে যে জামায়াত মডারেট ডেমোক্রেটিক পার্টি কিন্তু তা জামায়াতের আচরণে দেখা যাচ্ছে না। ভারত চায় বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, জাতীয়তাবাদ ও সোশ্যালিস্ট আদর্শে মানুষ থাকুক। অনেক মানুষ আওয়ামী লীগ বা হাসিনাকে ঘৃণা করতে পারে কিন্তু সে বা তার দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দাঁড়িয়ে ছিল।
জয়িতা বাংলাদেশকে পশ্চিমা দেশের হাত থেকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাওয়ার পরামর্শ চাইলে বীণা বলেন, বাংলাদেশের কারণে ভারতের নিরাপত্তার রেডলাইন অতিক্রম কেউ করছে কি না সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বলে ভারত আওয়ামী লীগ বা হাসিনাকেই শুধু সমর্থন করে। হাইকমিশনার থাকাকালে সব দলের সাথে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশের কাছে ভারতের চাওয়া হচ্ছে দয়া করে আমাদের নিরাপত্তার রেডলাইন অতিক্রম যেন কেউ না করে। ওই সময়ে উত্তরপূর্ব ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ সমর্থন জানায়নি বলে আমরা তাদের সম্মান করি। হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে অনুপ চেটিয়াকে ফেরত পাঠান, বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ক্যাম্প তুলে দেন। এখন তার উল্টো কথা বলা হচ্ছে। ভারতের নিরাপত্তা বিঘিœত না করে দু’টি দেশের মধ্যে সব ধরনের সহযোগিতা সম্ভব। আমাদের উভয় দেশের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার ও সম্মান করতে হবে। গত পনের বছরে উত্তরপূর্ব ভারতে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদ ছিল না, সেখানে উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশকে ভারত তার সেফগার্ড হিসেবে দেখতে চায়।
বীণা বলেন হাসিনা ভারতে চলে আসায় বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। কারণ তারা দেখেছে ভারত তাকে সমর্থন দিচ্ছে। কিন্তু ১৮ মাস পরেও হিউজ অ্যাডিশনাল অ্যান্টি ইন্ডিয়ানিয়াজম বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে সীমান্তসহ অন্যান্য কারণে। বাংলাদেশের মানুষ এখন উপলব্ধি করছে আগেই ভালো ছিল। গত ১৮ মাসে যা ঘটেছে তা বাংলাদেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্থিতিশীলতায় কোনো সাহায্য করেনি। আমরা বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি একইসাথে দেশটির সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। ভারতের জন্যে এটা এখন বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ যুদ্ধবিমান কিনছে। পরিস্থিতি ’৭১-এর পূর্বের মতোই দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনে জামায়াত উর্দু ভাষায় প্রচারণা চালানোর পর বিএনপি তাই করছে। বাংলাদেশে এসব রিহার্সেল দেখে ভারত অবাক।
গত ১৮ মাস বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বীণা বলেন, আওয়ামী লীগ হোক, মুক্তিযুদ্ধের কোনো স্মৃতিভাস্কর্য হোক, কোনো প্রতিষ্ঠান হোক সেগুলো রেহাই পাচ্ছে না। যারা বাংলাদেশে আজকে শাসন করছে তারা ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি। পাকিস্তান ও ডিপস্টেট তাদের সহায়তা করছে। পাকিস্তান পরাজিত হয়েছিল, জামায়াতে ইসলামী পরাজিত হয়েছিল, তখনো ১৫-২০ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন দেয়নি। ডিপস্টেট পরাজিত হয়েছিল। নিক্সন কিসিঞ্জারের ডায়ালগের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন এরাই এখন বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা পরিচালনা করছে। তারা যেকোনো উপায়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
বীণা বলেন বাংলাদেশে এখন যারাই ওয়াবি ইসলামে বিশ্বাসী নয় তারাই আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সে সংখ্যালঘু হোক কিংবা সুফি বা আহমদিয়া হোক। তারা হত্যা, ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তাদের সম্পদ লুট করা হচ্ছে। হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভাইব্রান্ট ছিল, প্রবৃদ্ধির হার ৬-৭ শতাংশে পৌঁছেছিল, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তিরত হচ্ছিল বাংলাদেশ। এখন অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। সামাজিক সূচকের দিকে লক্ষ্য করলে হাসিনার শাসনামলে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ কোনো কোনো সূচকে বেশ ভালোই করছিল; কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস প্রচণ্ড ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়ায় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ইউনূস চেষ্টা করছেন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতাকে বিনষ্ট করতে। যেখানে উভয় দেশ লাভবান হয়েছিল। ভারতের সাথে বিভিন্ন প্রকল্প, কানেক্টিভিটি ছাড়াও বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচার খাতের আমদানি রফতানিকারকরা ভারত থেকে সস্তা মূল্যে যেসব উপকরণ পেতেন তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমছে, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ছে। নীতি ও বিধি পরিবর্তনের ফলে তারা সময়মতো ভারত থেকে পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। ভারতের পরিবর্তে তারা পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল থেকে পণ্য আমদানি করছেন। এতে সময় ও অর্থ বেশি লাগছে।
বীণা সিক্রি বলেন বাংলাদেশে গত ৩০ বছরের বেশি সময়ে খালেদা বা হাসিনার মতো নারী নেতৃত্বের শাসনামলে যে সামাজিক সূচকের উন্নয়ন ঘটেছিল তা থেকে দুঃখজনক পরিস্থিতিতে দেশটি পৌঁছে গেছে। নারীদের ঘরের বাইরে আসতে দেয়া হচ্ছে না। কাজের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। নারীরা খুবই অখুশি। বাংলাদেশের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৪ শতাংশের নিচে ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর কোনো নারী প্রার্থী নাই। বিএনপিতে আড়াই শ’ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারী প্রার্থী রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষমতায় জামায়াতে ইসলামী যাতে আসতে পারে সে সমর্থন দিচ্ছে।
পডকাস্টের উপস্থাপক জয়িতা বসু ওয়াশিংটন ডিসিতে লোকজনের সাথে কথাবার্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পৃক্ততা বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আগ্রহ বা সমর্থন বাড়ছে। বীণা সিক্রি জয়িতার এ বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, কাতার এ ধরনের সংগঠনের পেছনে অর্থায়ন করছে। জামায়াতের সাথে মুসলিম ব্রাদার হুডের মতাদর্শগত মিল রয়েছে এবং বাংলাদেশে তারা এমন শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চাচ্ছে যেখানে নারীরা দুর্গতির শিকার হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের এ রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রচেষ্টার সাথে তুরস্ক খুবই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গত বছর তুরস্কের ডেলিগেট বাংলাদেশ সফর করেছে। এ ডেলিগেট মুহাম্মদ ইউনূস ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করেছে। তারা বলেছে, ভারতের বিকল্প হিসেবে সব ধরনের সহায়তা বাংলাদেশকে দিতে প্রস্তুত তুরস্ক। মুহাম্মদ ইউনূস তুরস্ক, চীন, পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। গত বছর ঢাকায় ব্রিটেনের হাইকমিশনার বাংলাদেশের নির্বাচন ইনক্লুসিভ বা আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের কথা বললেও এখন তারা ইনক্লুসিভের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছেন। তারা এখন বলছেন ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তি মানে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ। তাদের এ অবস্থান পরিবর্তন খুবই দুঃখজনক। নেপালে ও শ্রীলঙ্কায় জেনজি বিপ্লব হয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে নির্বাচনে কোনো দলকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচনে অংশগ্রহণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বিএনপি ক্যাডারভিত্তিক পার্টি নয়, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী ক্যাডারভিত্তিক পার্টি। জামায়াতে ইসলামীর ভিত্তি রয়েছে গ্রামীণ মানুষের সমর্থনের ওপর। বিএনপি শহর বা উপশহরভিত্তিক পার্টি। জামায়াতের সমর্থকদের ওপর ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপি নির্ভরশীল। বিএনপির সমাবেশে জামায়াতের সমর্থকদের উপস্থিতির প্রয়োজন পড়ে। ৬০-৬৫ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের গ্রামে বাস করে। জামায়াতের সমর্থন ছাড়া বিএনপি অসহায়। এবং আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করার ফলে জামায়াতে ইসলামী এখন প্রধান বিরোধী দল।
নির্বাচনে জামায়াত কি জয়ী হতে যাচ্ছে জয়িতার এমন প্রশ্নের জবাবে বীণা সিক্রি বলেছেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর গত পাঁচ মাস আগে বাংলাদেশে প্রথম আলোর একটি জরিপের উল্লেখযোগ দু’টির একটি হচ্ছে ৭০ শতাংশ মানুষ চায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। কিন্তু পরবর্তী জরিপে দেখা যাচ্ছে জামায়াতের সমর্থন বাড়ছে। বিএনপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে দলটি। তারেক রহমান ভারতীয় মিডিয়াকে বলেছেন নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ নয়। ঢাকার বাইরে থেকে ১৫ লাখ ভোটারকে মাইগ্রেট করে নিয়ে আসা হয়েছে। যে পরিবারে পাঁচজন বাস করতো এমন পরিবারে এখন ২০ জন বাস করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগের কথা শোনা যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে জামায়াত সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এটা প্রায় নিশ্চিত।
বীণা বলেন আওয়ামী লীগকে কোনো কারণ ছাড়াই রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠান জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে। ৫ আগস্টের পর হিন্দু আমলা, হিন্দু পুলিশ, হিন্দু কর্মকর্তাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। বুরোক্রেসি, অ্যাকাডেমিয়া এমনকি মিডিয়া বিস্ময়করভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে জামায়াত। আগে হাসিনার নিয়ন্ত্রণে ছিল মিডিয়া এমন ব্লেম দেয়া হতো। এখন মিডিয়া কঠোর নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মিডিয়া পরিচালনায় হাত বদল হয়েছে। বাংলাদেশের সব ইনস্টিটিউশনে জামায়াতের মানুষ বিরাজ করছে। বাংলাদেশে আদৌ কোনো ফ্রি মিডিয়া নেই। শতাধিক সাংবাদিক গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছে কোনো অভিযোগ ছাড়াই। এফআরআই, জামিন, বিচার হচ্ছে না। কোনো আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংগঠন এ নিয়ে কথা বলছে না। হাসিনার বিচার ক্যাঙ্গারু কোর্টে হয়েছে। ন্যায্যবিচার হয়নি। জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদনে ১৪ শ’ মানুষকে হত্যার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ মারা গেছে হাসিনা ঢাকা ছেড়ে আসার পরে। কোনো অনুসন্ধান, কোনো তদন্ত হয়নি এসব হত্যাকাণ্ডের। হাসিনা ঢাকা ছাড়ার আগে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী সাড়ে ৩ শ মানুষ মারা গিয়েছিল। এ দু’টি মিডিয়ার অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে এবং তারা ডোর টু ডোর তথ্য যাচাই করে দেখেছে। সহস্রাধিক পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। সন্ত্রাসের সমন্বয় হয়েছে জামায়াত ও শিবিরের মাধ্যমে। এটা ছাত্রদের কোনো বিদ্রোহ ছিল না। এমন নয় যে, পুলিশ সেখানে সন্ত্রাস করেছে। হাসিনার পক্ষে সেনাবাহিনীর সমর্থন সরিয়ে নেয়া খুবই হতাশাজনক। কোটা বৈষম্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। হাসিনা পাঁচ বছর আগেই কোটা বৈষম্য দূর করেছিলেন।
বীণা বলেন, হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ৪ আগস্ট পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে তাদের দায় থাকার কথা এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে বলেছেন। আমরা যেকোনো ধরনের তদন্ত করতে রাজি। ইউনূস ইতোমধ্যে ছাত্রদের ইনডেমনিটি দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পরও একই ধরনের ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল। তখন যা ঘটেছিল সমান্তরালভাবে বাংলাদেশে এখন তাই ঘটছে। মুহাম্মদ ইউনূস জামায়াতের মুখপাত্র মাত্র। বিএনপির সাথে জোট গঠনে জামায়াত মোটেই আগ্রহী ছিল না। জামায়াত সব ইসলামী দলকে নিয়ে জোট করেছে। ইসলামী আন্দোলন সে জোট থেকে বের হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারছে জুলাই আন্দোলন কোনো ছাত্র বিদ্রোহ ছিল না। এ কারণে এনসিপি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংসদ নির্বাচনে কোনো আসন পায়নি।



