দেশের আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে একগুচ্ছ সংস্কার ও উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে তিনি অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে সিনিয়র অর্থনীতি সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে গভর্নর এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকে চার ডেপুটি গভর্নর, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পত্রিকার অর্থনীতিবিটের সিনিয়র সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিয়ম সভায় গভর্নর জানান, মাত্র ১৮ কার্যদিবসে তিনি ৪১টি বৈঠক করেছেন বাহ্যিক স্টেকহোল্ডারদের সাথে এবং ৩২টি বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে। এসব বৈঠকে মূল গুরুত্ব দেয়া হয়েছে- কিভাবে আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যায় এবং নীতিনির্ধারণে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা যায়।
তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘কোনো অবস্থাতেই রাজনৈতিক চাপে নত হওয়া যাবে না।’ ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এই অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ও ব্যাংক সংস্কার : স্টোলেন অ্যাসেট বা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি সময় সাপেক্ষ ও জটিল হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গভর্নর বলেন, সফলতার হার কম হলেও এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকসহ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন পেছনে নেয়ার সুযোগ নেই, বরং দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। এ লক্ষ্যে দ্রুত নতুন বোর্ড গঠন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দেয়া হবে। একই সাথে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
স্টার্টআপ ফান্ড ও রুরাল ইমপ্যাক্ট : দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নতুন স্টার্টআপ ফান্ড চালু করতে যাচ্ছে। এপ্রিলের মধ্যে ফান্ডের কার্যক্রম শুরু হবে এবং জুন থেকে বিতরণ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর। এই তহবিলে বিশেষভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে- এমন উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
প্রবৃদ্ধির তিন অগ্রাধিকার খাত : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে- প্রথমত বড় শিল্প গ্রুপগুলোকে ফ্যাসিলিটি দেয়া, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে শক্তিশালী করা ও বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করা। গভর্নরের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো জাতীয় সম্পদ। এগুলো পুনরায় চালু করা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাশলেস অর্থনীতি ও বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক : ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী জুনের মধ্যে সব পেমেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর কোড বাধ্যতামূলক করা হবে এবং ১ জুলাই থেকে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। এরপর নিয়ম না মানলে জরিমানা করা হবে। গভর্নর মনে করেন, ক্যাশলেস লেনদেন বাড়লে সরকারের রাজস্বও বাড়বে এবং লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। একই সাথে লেনদেন খরচ কমে আসবে।
মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক চাপ : বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্কটকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর বলেন, এ সঙ্কটের দ্রুত সমাধান নেই এবং এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। সরকারকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্কভাবে মুদ্রানীতি পরিচালনা করছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
এসএমই খাত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ : এসএমই খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সহজ শর্তে ঋণ দেয়া, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঋণ আবেদন এবং টার্গেটেড ক্রেডিট সাপোর্ট দেয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। গভর্নর বলেন, ‘যদি বিনিয়োগকারীরা লাভ নিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে কেউ বিনিয়োগে আসবে না।’ তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় লক্ষ্য।
ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা, তথ্যপ্রাপ্তি এবং গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। আমানতকারীরা যাতে দ্রুত তাদের অর্থ ফেরত পান, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সাথে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এতে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের পরামর্শ : বৈঠকে অংশ নেয়া অর্থনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে- বিলাসী পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা, উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ বৃদ্ধি, সুদের হারে প্রণোদনা, রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখা, এক্সচেঞ্জ রেট স্থিতিশীল রাখা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। তারা আরো বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়ে যাচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি : বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বহিরাগত ধাক্কা মোকাবিলায় অন্তত ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সক্ষমতা তৈরি রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের তাৎক্ষণিক চাপ রয়েছে, যা ব্যবস্থাপনার মধ্যে আছে। তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স হ্রাস এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ- সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ও সতর্ক নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধি, এসএমই খাতের উন্নয়ন এবং বৈদেশিক ঝুঁকি মোকাবিলা- এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত উদ্যোগগুলো কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। কারণ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথচলা।



