দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা শেষ করে বের হচ্ছেন। তাদের হাতে চকচকে সনদ। অথচ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো হন্যে হয়ে খুঁজছে দক্ষ কর্মী, কিন্তু পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অদক্ষ কর্মী ও ক্ষেত্রবিশেষে বাইরে থেকে কর্মী এনে কাজ চালাতে হচ্ছে। এই অদ্ভুত প্যারাডক্স বা এর বৈপরীত্যই এখন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার নির্মম বাস্তবতা।
নানা পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার দিন দিন বাড়ছে, অথচ শিল্পমালিকরা হন্যে হয়ে দক্ষ কর্মী খুঁজছেন। এই অদ্ভুত দ্বিমুখী সঙ্কটের কারণে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি (ছয় বিলিয়ন) মার্কিন ডলার নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশীরা, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কাজ করছেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।
লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারের হার ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জন গ্র্যাজুয়েটের মধ্যে ৪৭ জনই বেকার। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, দেশে মোট বেকারের প্রায় ১২ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত।
বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ শতাংশই বেকার থাকছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির (সিপিডি) তথ্যমতে, তৈরী পোশাক খাতসহ (আরএমজি) বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানে মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় দক্ষ দেশী কর্মীর অভাবে ভারত, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের কর্মী নিয়োগ দিতে হচ্ছে। ফলে রেমিট্যান্স হিসেবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ, দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে পাহাড়সম ব্যবধান। এই সঙ্কট ও সমাধানের পথ কিভাবে বের করা সম্ভব তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ ও ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাদের কথায় উঠে এসেছে সঙ্কটের মূল কারণ ও উত্তরণের উপায়।
সেকেলে সিলেবাস ও মুখস্থবিদ্যার দাপট : অধিকাংশ শিক্ষাবিদই মনে করেন, আমাদের পাঠ্যক্রম বা সিলেবাস যুগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ‘পৃথিবী যেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা এআই যুগে প্রবেশ করেছে, আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ২০ বছর আগের সিলেবাস পড়ানো হচ্ছে। একজন সিভিল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাস করে যখন ফিল্ডে যান, তখন দেখেন তিনি যা পড়েছেন, তার সাথে আধুনিক মেশিনারিজের কোনো মিল নেই। ইন্ডাস্ট্রি চলে লেটেস্ট টেকনোলজিতে, আর আমরা ক্লাসরুমে পড়াচ্ছি সেকেলে থিওরি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) একজন অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের সঙ্কটটা হলো মুখস্থনির্ভরতা। শিক্ষার্থীরা জিপিএ ৫ বা ভালো সিজিপিএ পাওয়ার জন্য পরীক্ষার আগে নোট মুখস্থ করে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে প্রয়োজন ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ বা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বইয়ের সংজ্ঞা মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করা যায়, কিন্তু করপোরেট বোর্ডে সমস্যা সমাধান করা যায় না। এই জায়গাটিতেই আমাদের গ্র্যাজুয়েটরা পিছিয়ে পড়ছেন।’
ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব : থিওরি বা তত্ত্বীয় জ্ঞানের বাইরে ব্যবহারিক ক্লাসের অপ্রতুলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম মাইনুল ইসলাম বলেন, দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিশষ্ঠানের ‘ল্যাবরেটরিগুলো যেন একেকটা জাদুঘর। আধুনিক সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের সাথে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার মতো বাজেট অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই। একজন শিক্ষার্থী কম্পিউটার সায়েন্সে পড়েও যদি ক্লাউড কম্পিউটিং বা সাইবার সিকিউরিটির প্র্যাকটিক্যাল কাজ না জানে, তবে তাকে ইন্ডাস্ট্রি কেন নিয়োগ দেবে? আমাদের ল্যাব আর ইন্ডাস্ট্রির ফ্লোরের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।’
একই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড রিজভী শাহরিয়ার বলেন , ‘কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে শিক্ষার চেয়ে খাতায়-কলমে শিক্ষার চর্চা বেশি হচ্ছে। একজন অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার পাস করা ছাত্র আধুনিক হাইব্রিড গাড়ির ইঞ্জিন খুলতে ভয় পায়। কারণ সে পড়ার সময় কেবল ডায়াগ্রাম দেখেছে, ইঞ্জিন খোলার সুযোগ পায়নি। এই ভীতি নিয়ে চাকরিতে ঢুকলে সে তো অদক্ষ হিসেবেই বিবেচিত হবে।’
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) একজন সহযোগী অধ্যাপক মন্তব্য করেন, ‘যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল অভিজ্ঞতা নেই। যিনি কখনো ফ্যাক্টরি ফ্লোর দেখেননি, তিনি কিভাবে ছাত্রকে শেখাবেন সেখানে কাজ কিভাবে হয়? শিক্ষকদের নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রিতে ‘অ্যাটাচমেন্ট’ বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।’ বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সংযোগের অভাব : ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) পরিচালক মাহবুবুল আলম বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি মালিকরা বিশ্ববিদ্যালয়কে জানান না তাদের কী ধরনের কর্মী দরকার। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ও জানতে চায় না। এই ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’ দূর করতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ থাকা উচিত, যেখানে ব্যবসায়ীরা সিলেবাস প্রণয়নে মতামত দেবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) একজন গবেষক বলেন, ‘বাজারের চাহিদা না বুঝেই আমরা ঢালাওভাবে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি। হয়তো আগামী পাঁচ বছরে আইটি খাতে ১০ হাজার লোক লাগবে, কিন্তু আমরা পাস করাচ্ছি এক লাখ। আবার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার দরকার ৫০ হাজার, পাস করছে ১০ হাজার। এই ডিমান্ড-সাপ্লাই মিসম্যাচ বা অসামঞ্জস্যতা বেকারত্ব বাড়াচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব কায়সার বলেন, ‘আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে হোয়াইট কালার জব বা ডেস্ক জবের প্রতি মোহ বেশি। কেউ মাঠে বা ফ্লোরে কাজ করতে চায় না। এই মানসিকতা পরিবর্তন না করলে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন।’
সফট স্কিলস : অদৃশ্য অথচ অপরিহার্য
কেবল টেকনিক্যাল জ্ঞান নয়, পেশাদারিত্ব ও যোগাযোগের দক্ষতার (সফট স্কিলস) অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন শিক্ষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমি যখন ইন্টারভিউ বোর্ডে বসি, তখন দেখি ছেলেমেয়েদের টেকনিক্যাল নলেজ হয়তো ভালো, কিন্তু তারা নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে না। টিমওয়ার্ক, লিডারশিপ বা সাধারণ ইমেইল এটিকেটটুকুও অনেকের জানা নেই। ইন্ডাস্ট্রি এমন কর্মী চায় যারা দলের সাথে মিশে কাজ করতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি এই সোশ্যাল স্কিলগুলো শেখাচ্ছে? উত্তর হলো না।’
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক সদস্য ও শিক্ষাবিদ বলেন, ‘বাজারের চাহিদা কী, তা নিয়ে প্রতি দুই বছর অন্তর জরিপ হওয়া প্রয়োজন। টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি বা অ্যাগ্রো, কোনো সেক্টরে আগামী পাঁচ বছরে কত লোক লাগবে এবং কী কী দক্ষতা লাগবে, সেই অনুযায়ী কারিকুলাম ডিজাইন করতে হবে। অন্ধের মতো গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে বেকারত্ব বাড়ানো কোনো কাজের কথা নয়।’
বিশেষজ্ঞদের আলোচনার ভিত্তিতে সঙ্কট উত্তরণের জন্য নিচের পাঁচটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি : ১. সিলেবাস আধুনিকায়ন : প্রতি দুই বছর অন্তর ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করতে হবে এবং সিলেবাস প্রণয়ন কমিটিতে বাধ্যতামূলকভাবে শিল্প খাতের প্রতিনিধি রাখতে হবে ২. বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণ: গ্র্যাজুয়েশনের আগে অন্তত ছয় মাসের ‘পেইড ইন্টার্নশিপ’ বা শিক্ষানবিসকাল বাধ্যতামূলক করতে হবে, যার মূল্যায়ন করবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ৩. জাতীয় দক্ষতা ডাটাবেস তৈরি: আগামী ১০ বছরে কোন খাতে কত কর্মী লাগবে, তার একটি জাতীয় সমীক্ষা বা প্রজেকশন তৈরি করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে ৪. শিক্ষকদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং: শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা বা কোলাবোরেশনকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করতে হবে ৫. সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার : প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টারকে শক্তিশালী করতে হবে, যেখানে প্রথম বর্ষ থেকেই ভাষা, নেতৃত্ব ও আইটি দক্ষতা শেখাতে হবে ।
বিশেষজ্ঞদের এই মতামতগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার, একক কোনো প্রচেষ্টায় এই সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষাঙ্গন ও কর্মক্ষেত্রের এই দূরত্ব ঘোচাতে প্রয়োজন আমূল সংস্কার, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম এবং মানসিকতার পরিবর্তন। নতুবা ‘শিক্ষিত বেকার’ তৈরির কারখানাই হয়ে থাকবে আমাদের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো।



