অবশেষে ‘দুখু মিয়া’র দুঃখের অবসান

Printed Edition
বাবুগঞ্জে পাকা ঘরের কাগজ হস্তান্তর করছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন : নয়া দিগন্ত
বাবুগঞ্জে পাকা ঘরের কাগজ হস্তান্তর করছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন : নয়া দিগন্ত

খালিদ সাইফুল্লাহ বরিশাল ব্যুরো

জন্মের সময় থেকেই দুঃখ যেন ছিল তার নিয়তি। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া শিশুটির পৃথিবীর আলো দেখা নিয়েও ছিল শঙ্কা। মা-ছেলে দুজনই সমাজের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন বছরের পর বছর। সেই ‘দুখু মিয়ার’ জীবনে অবশেষে এসেছে আলোর দেখা। বরিশালের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন তাদের জন্য তিন শতাংশ জমি কিনে দিয়েছেন, সমাজসেবা অধিদফতরের সহায়তায় নির্মাণ হয়েছে একটি পাকাঘর নাম রাখা হয়েছে ‘শান্তির নীড়’।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সেই ঘরের চাবি দুখু মিয়া ও তার মায়ের হাতে তুলে দেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক এ কে এম আক্তারুজ্জামান তালুকদার, ইউএনও ফারুক আহমেদ, সমাজসেবা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেন ও সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবিরসহ গণমাধ্যম কর্মীরা।

চাবি হাতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন দুখুর মা। তিনি বলেন, এক মুঠো চাল দেয়ার মতো কোনো আত্মীয়স্বজনও পাশে ছিল না। সবাই দূরে সরে গিয়েছিল, খারাপ মেয়ের তকমা লেগেছিল গায়ে। একমাত্র বাবাই পাশে ছিলেন। ২২ বছর ধরে সন্তান নিয়ে কষ্ট করেছি। আজ মনে হচ্ছে, আল্লাহ অবশেষে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তিনি জানান, এখন তাঁর একমাত্র দাবি সন্তানের পিতৃত্বের স্বীকৃতি।

জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ভাগ্যবিড়ম্বিত এই নারী আজ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন। তাঁর সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব একটি এনজিও নিয়েছে। ভবিষ্যতে দুখু মিয়ার চাকরির বিষয়েও গুরুত্বসহকারে ভাবা হবে।

জানা যায়, ২০০৩ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সালাম সরদারের ছেলে গিয়াস উদ্দিন এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। সালিশে বিয়ের রায় হলেও গিয়াস তা অস্বীকার করে কিশোরীকে গর্ভপাতের চাপ দেয়। পরে প্রশাসনের সহায়তায় মামলা হলে গিয়াস গ্রেফতার হয়। এরপর গিয়াসের পরিবার নির্যাতন করে গ্রাম থেকে কিশোরীর পুরো পরিবারকে বিতাড়িত করে। ২০০৪ সালের ৯ জুন জন্ম নেয় দুখু মিয়া। একই বছরের অক্টোবরে জামিনে মুক্ত গিয়াস শিশুটিকে হত্যার চেষ্টা করে। আদালতের নির্দেশে মা-ছেলেকে নিরাপত্তার জন্য পাঠানো হয় ‘সেইফ হোমে’। সেখানে দুই বছর থাকার পর এক দয়ালু ব্যক্তির পরিত্যক্ত ঘরে আশ্রয় মেলে তাদের।

সংসারের তাগিদে ২০০৬ সালে দুখুর মা ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে চাকরি নেন, আর নানি কাজ করে সংসার চালান। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০১১ সালের ২৪ মার্চ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গিয়াস উদ্দিনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় এবং নির্দেশ দেয় দুখু মিয়ার ২১ বছর বয়স পর্যন্ত তার ভরণপোষণ রাষ্ট্র বহন করবে। সে অনুযায়ী মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদফতর থেকে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ টাকা করে দেয়া হয়, যা এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দুখু মিয়া দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। সম্প্রতি যখন তার ভরণপোষণের শেষ কিস্তি আসে, তখন জেলা প্রশাসক বিষয়টি জেনে তার স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।

এই মানবিক উদ্যোগে যুক্ত হয় সমাজসেবা অধিদফতর, বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এবং সেইন্ট বাংলাদেশ। জমি কেনা, ঘর নির্মাণ ও আসবাবপত্র জোগাড় করে তৈরি হয় মা-ছেলের স্বপ্নের আশ্রয় ‘শান্তির নীড়’।