নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম
সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে ময়দার দাম। কয়েকটি শিল্পগ্রুপের বাজারে অনুপস্থিতির সুযোগে বাজারে সক্রিয় শিল্পগ্রুপগুলো একচেটিয়া দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে। গেল কোরবানির ঈদের পর হতে পাইকারি বাজারেই বস্তাপ্রতি(৫০ কেজি) সাড়ে ৩০০ টাকা হিসেবে কেজিতে সাত টাকা বেড়েছে ময়দার দাম। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, ডলার সঙ্কটের কারণে পর্যাপ্ত এলসি হচ্ছে না। ফলে কানাডিয়ান কোয়ালিটির গমের সর্টেজ রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কানাডিয়ান গমের গুণগত মান ভালো, ফলে এর বাজারে চাহিদাও ব্যাপক। কিন্তু এলসির সঙ্কটে বাজারে কানাডিয়ান কোয়ালিটির গমের স্বল্পতা রয়েছে। ব্যাংকগুলোর নানা শর্তের কারণে ক্ষুদ্র আমদানিকারকরা সহজেই ব্যাংকের সহায়তা পান না। ফলে আমদানিকারকদের সংখ্যাও হাতে গোনা। পাশাপাশি আর্জেন্টাইন গম বাজারে থাকলেও গুণগত মান দুর্বল হওয়ায় এর চাহিদা কম। সামগ্রিকভাবে বাজারে সরবরাহ সঙ্কট দেখা দেয়ায় ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিচ্ছেন বলে সূত্র জানায়। সূত্রমতে- গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) সাড়ে ৩০০ টাকা দাম বেড়েছে। গতকাল বুধবার প্রতি বস্তা ময়দা ২৬ শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা আগে ছিল দুই হাজার ২৫০ টাকা। এতে পাইকারিতেই খোলা ময়দার দাম কেজিতে সাত টাকা টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
গতকাল প্যাকেটজাত আটার মিলের রেট ছিল ৫০ টাকা কেজি, আর ময়দার মিল রেট ছিল ৬০ টাকা কেজি। আর খুচরায় তা বিক্রি হচ্ছে আটা ৫২-৫৫ টাকা এবং ময়দা ৬২-৬৫ টাকা।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে গমের বার্ষিক চাহিদা ৫০ লাখ টনের বেশি। দেশে সীমিত পরিসরে গমের উৎপাদন হলেও চাহিদার বেশির ভাগই আমদানিনির্ভর। আর গমের আমদানিকারকও হাতেগোনা। বৃহৎ করপোরেট হাউজগুলো ভোগ্যপণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। পাশাপাশি ছোট আমদানিকারকরাও ভোগ্যপণ্য আমদানিতে পর্যাপ্ত এলসি পাচ্ছেন না। এর বাইরে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে চালের দাম বাড়িয়ে রেখেছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও বিদ্যুৎ খরচ বৃদ্ধিসহ সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সূত্রমতে, এখন মৌসুমি ফলের আধিক্যের কারণে চাল, গম ও ভোজ্য তেলের উপর চাপ কম। কাঁঠাল, আনারস ও আম উঠে গেলে ভাত ও গমের চাপ বাড়বে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, সরকারকে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাড়ানো চালের দাম আর কমেনি
ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলী হামলায় যুদ্ধ শুরুর অব্যবহিত পরই হাওর এলাকায় বন্যার পর পর চাল ব্যবসায়ীরা পরিবহন সঙ্কটসহ নানা অজুহাতে দাম বাড়িয়েছিল সব ধরনের চিকন চালের। তখন বস্তাপ্রতি ৫০০ টাকা পর্যন্ত (৫০ কেজি বস্তা) দাম বাড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত সেই দাম আর কমেনি। শহর এলাকার বেশির ভাগ মানুষ চিকন চাল খেয়ে অভ্যস্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন চিকন চালের পুরো বাজারই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে করপোরেট হাউজগুলো। এর পাশাপাশি বর্ষা সামনে রেখে নাটোর অঞ্চলের চাতাল মালিকরা চাল মজুদ করছেন। তা ছাড়া বাজার থেকে বড় কয়েকটি গ্রুপ সরে যাওয়াতেও সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ সঙ্কটের অজুহাতে নানা কৌশলে আর দাম কমাচ্ছেন না চাল ব্যবসায়ীরা। চাল আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের মাঝেই দাম বাড়িয়েছিলেন এসব অসাধু সিন্ডিকেট।
খাতুনগঞ্জের মাইশা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আবদুল হান্নান নয়া দিগন্তকে বলেন, মূলত হাওরের বন্যায় ফসল মার খেয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহের একটা সঙ্কট আছে। চিকন চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হলেও মোটা চালের বাজার স্বাভাবিক আছে বলে তিনি জানান। তার মতে, শহর এলাকার মানুষরা চিকন চাল খেয়ে অভ্যস্ত। আর কাটারি, নাজিরশাইলসহ চিকন চালের পুরো বাজার করপোরেট হাউজগুলোর নিয়ন্ত্রণে বলে তিনি দাবি করেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আগে চিকন চালের দামে বড় ব্যবধান থাকলেও এখন প্রতিটন কাটারি চালের বুকিং রেট ৫৭০-৫৮০ ডলার বলে জানান তিনি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সীমিত প্রভাবও চালের দামে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন- ১৫ টনের ট্রাকের ভাড়া আগে ২০ হাজার টাকা থাকলেও এখন তা ২৫ হাজার টাকা গুণতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ী দিদারুল আলম বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও মানুষ কি পরিবর্তন হয়েছে? কোনো কিছুর দাম কমেনি। সরকারের শুল্ক ছাড়ের ফলে চালের দাম কমার কথা থাকলেও কমেনি। শুল্ক কমানোর প্রভাব বাজারে নেই। আমদানির কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী বলেন, দাম কমাতে চাইলে আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য সরকার। নইলে দাম কমানো যাবে না। তিনি বলেন, বড় বড় করপোরেট হাউজগুলো চালের কারখানা স্থাপন করায় এখন কোম্পানিগুলো চাল মজুদ করছে। ফলে চালের বাজারের বেশির ভাগ কর্তৃত্ব এখন করপোরেট হাউজের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ছোট ব্যবসায়ীদের হাতে এখন চালের ব্যবসা নেই। তাই আমদানি না করলে দাম কমানো যাবে না। তা ছাড়া চিনিগুড়া, কালিজিরাসহ সুগন্ধি চাল বাইরে রফতানি হওয়ায় সেগুলোর দাম বেড়েই চলছে বলেও তিনি জানান।
টিসিবির তথ্য যা বলছে
টিসিবির হিসাবে গতকাল বুধবার খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৫/৪৬ টাকা। গত এক বছরের ব্যবধানে খোলা আটার দাম বেড়েছে ৭.০৬ শতাংশ। এর মধ্যে গত এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ৫.৮১ শতাংশ। প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা। প্যাকেটজাত আটার দাম বেড়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৫২ শতাংশ।
টিসিবির হিসাবে খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫-৬০ টাকা। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৫৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া প্যাকেটজাত ময়দা বিক্রি হচ্ছে কোম্পানি ভেদে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী- মোটামুটি মানের সরু চাল (নাজিরশাইল, মিনিকেট) প্রতি কেজি ৭২ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব চালের দাম গত এক মাসে কেজিতে এক টাকা ২৯ পয়সা বেড়েছে। মাঝারি মানের পাইজাম ও ২৮ বেতি চাল প্রতি কেজি ৫৫ হতে ৬৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে যা গত এক মাসের ব্যবধানে কেজিতে আড়াই টাকা বেশি। মোটা চাল (স্বর্না, চায়না ইরি) প্রতি কেজি ৫০ হতে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত একমাসের ব্যবধানে কেজিতে এক টাকা ৮৫ পয়সা বেশি।



