হরমুজে অস্থিরতায় চাপ বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে

শাহ আলম নূর
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা করছে। এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর পরোক্ষভাবে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল, যা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০-২১ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ থেকে ২ কোটি ব্যারেল তেল এই পথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে পৌঁছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো বড় তেল রফতানিকারক দেশগুলো এই রুটের ওপর নির্ভরশীল।

সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা ও সংঘাতের আশঙ্কার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ৮৫-৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেলের এই অস্থিরতা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।

বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়, যার জন্য প্রায় ৭-৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৬০০-৮০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যয়ের বড় প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্পখাতে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১০-১২ শতাংশ এখনো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি দামের ওপর নির্ভরশীল। এতে তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, এতে সব ধরনের পণ্যের দামেও চাপ পড়ে। হিসাব অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে পরিবহন ব্যয় ৪-৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম ২-৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার ঝুঁকি থাকে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য পরিবহন সড়ক পথে ডিজেলচালিত যানবাহনের মাধ্যমে হওয়ায় এই প্রভাব আরো বেশি দৃশ্যমান হয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্কটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রবাসী আয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বর্তমানে প্রায় ৯-১০ মিলিয়ন বাংলাদেশী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দেখা দিলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং কিছু খাতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বছরে ২-৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশের মোট রফতানি আয় ছিল প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বাড়লে উন্নত দেশগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় এবং ভোক্তা চাহিদা কমে যায়, এতে বাংলাদেশের রফতানি আদেশ কমার ঝুঁকি তৈরি হয়। পাশাপাশি শিপিং খরচও ১৫-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা রফতানি বাণিজ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে প্রায় ২০-২৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে এই রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে এবং ডলারের চাহিদা বাড়ে যা টাকার বিনিময় হারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বৈশ্বিক শকের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতা শুধুমাত্র জ্বালানি খাতেই নয়, বরং পুরো অর্থনীতির সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি একটি ইনফ্লেশন চেইন তৈরি করবে, যার প্রভাব খাদ্য, পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস, এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং জ্বালানি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি বৈচিত্রকরণ ছাড়া এ ধরনের বৈশ্বিক সঙ্কটের প্রভাব থেকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা কঠিন হবে।