সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে পাচার হচ্ছে এলপিজি

গভীর সঙ্কটে দেশের বাজার

এলপিজি গ্যাসের সঙ্কট, বাজারে সিলিন্ডার না পেয়ে কিংবা অতিরিক্ত দামে কিনে সাধারণ মানুষ যখন চরম ভোগান্তিতে আছেন ঠিক সেই সময় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ এলপিজি গ্যাস নিয়মিত পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারসহ পাশের দেশে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে এই অবৈধ কার্যক্রম।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

দেশজুড়ে রান্নাঘরে যখন এলপিজি গ্যাসের সঙ্কট, বাজারে সিলিন্ডার না পেয়ে কিংবা অতিরিক্ত দামে কিনে সাধারণ মানুষ যখন চরম ভোগান্তিতে আছেন ঠিক সেই সময় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ এলপিজি গ্যাস নিয়মিত পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারসহ পাশের দেশে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে চলছে এই অবৈধ কার্যক্রম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কক্সবাজার, টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের একাধিক সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে এলপিজি সিলিন্ডার ও বাল্ক গ্যাস মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। স্থানীয় পরিবহনশ্রমিক, ডিলার ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গভীর রাতে পিকআপ, ট্রাক, ভ্যান এমনকি মাছ ধরার নৌকায় করে গ্যাস সীমান্তের দিকে নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ ডিলার ও পরিবহন ব্যবস্থার আড়ালেই এই পাচার কাজ চলছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের এলপিজি বাজার এখন প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন এবং এর প্রায় ৯৮ শতাংশই আমদানি করতে হয়। ২০২৪ সালে যেখানে আমদানি হয়েছিল প্রায় ১৬ লাখ টন, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে আসে প্রায় ১৪ দশমিক ৭ লাখ টনে। এই আমদানি ঘাটতির মধ্যেই পাচার হওয়া পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার দেশটিতে গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যে অনেক এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দখলে থাকা অঞ্চলগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ করে দিচ্ছে বা সীমিত করে দিচ্ছে, যা সাধারণ জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগাইং অঞ্চলের কয়েকটি টাউনশিপে জান্তা সরকার বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করেছে। সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় রান্না, পানীয় জলের পাম্প ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনও সামগ্রিকভাবে কমেছে। কারণ বিদ্রোহীরা ট্রান্সমিশন লাইনগুলোতে হামলা চালিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইয়াঙ্গুনসহ বড় শহরগুলোতে বারংবার ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটছে।

সরকারি বা বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিদ্যুৎ-শক্তির গোলযোগের কারণে জ্বালানি পরিবেশনা ও দাম ওঠানামা করছে, যা নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাচারের প্রধান প্রণোদনা হচ্ছে দাম পার্থক্য। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামে দেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। অথচ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে একই পরিমাণ গ্যাসের দাম বাংলাদেশী দুই থেকে আড়াই হাজার টাকার কাছাকাছি। এই পার্থক্যের সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা প্রতি সিলিন্ডারে কয়েকশ’ টাকা লাভ করছে।

টেকনাফের এক পরিবহন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্যাস এখন স্বর্ণের মতো। যে দিকে বেশি দাম, সে দিকেই যাচ্ছে। ওপারে দাম বেশি, তাই ট্রাক সে দিকেই যায়। সবাই জানে; কিন্তু কেউ কিছু বলে না। এই বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয়, পাচার শুধু গোপনে নয়; বরং একধরনের নীরব সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যেই চলছে।

এলপিজি সঙ্কটের প্রভাব এখন দেশের প্রায় সবখানেই দৃশ্যমান। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ১২ কেজির সিলিন্ডার সরকারি দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অনেক এলাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না দিনের পর দিন। ঢাকার এক ডিলার জানান, স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দিনে এক হাজারের বেশি সিলিন্ডার সরবরাহ পাওয়া যেত, সেখানে এখন তিন-চার শ’ সিলিন্ডারও মিলছে না।

সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। নাইক্ষ্যংছড়ি ও টেকনাফের বাসিন্দারা জানান, তাদের এলাকায় গ্যাস প্রায় অদৃশ্য। অথচ তারা প্রতিদিনই দেখছেন ট্রাক ও নৌকায় করে গ্যাস সীমান্তের দিকে যাচ্ছে। স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, আমাদের ঘরে চুলা জ্বলে না; কিন্তু গ্যাস যাচ্ছে ওপারে। আমরা কি দেশের মানুষ না?

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এলপিজি পাচার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘ দিন ধরে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। সেখানে পাচার হওয়া জ্বালানি অবৈধ গোষ্ঠী কিংবা কালোবাজারে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী চক্রের কারণে এই পাচার কার্যক্রম দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারি পক্ষ অবশ্য পাচারের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না করলেও বাজারে সঙ্কট অস্বীকার করছে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশে এলপিজির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই এবং কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। তিনি জানান, রমজান সামনে রেখে প্রায় দেড় লাখ টন অতিরিক্ত এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানি কমে যাওয়া, ডলার সঙ্কট, এলসি জটিলতার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে পাচার- সবমিলেই বাজারে তীব্র সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সরকারের নজরদারি দুর্বল থাকায় এই পাচার দীর্ঘ দিন ধরে চলতে পারছে।

এ দিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এলপিজি পরিবহন ও ডিলার ব্যবস্থায় কার্যকর ট্র্যাকিং না থাকাই পাচারের বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কোন ডিলার কত সিলিন্ডার পেল এবং কোথায় বিক্রি করল এর কোনো ডিজিটাল নজরদারি নেই। ফলে একটি বড় অংশ সহজেই সীমান্তে চলে যাচ্ছে, অথচ কাগজে-কলমে সবকিছু ঠিকঠাকই দেখানো হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে আরো বড় সঙ্কট তৈরি হবে। রান্না, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী, যাদের জন্য বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি এখন স্পষ্ট এলপিজি পাচার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ নয়, এটি একটি সংগঠিত, লাভজনক এবং দীর্ঘ দিনের অবৈধ চক্রে পরিণত হয়েছে। কঠোর নজরদারি, সীমান্তে বিশেষ টাস্কফোর্স, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে এই সঙ্কট আরো গভীর হবে। আর এর মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই।